শিশুমনের জীবনকাঠি

childs-play

খন্দকার মুনতাসীর মামুন

শিশুর মনের পৃথিবী রঙিন। অনেক কল্পনা থাকে। অনেক ফ্যান্টাসি থাকে। সে রূপকথার বই পড়ে, গল্প শোনে। গল্পে তার সঙ্গে বন্ধু হয় সোনার হরিণ। বন্ধু হয়ে যায় রাজকন্যা মণিমালা। পক্ষীরাজে চড়ে সে দূরদূরান্তে উড়ে বেড়ায়। এভাবেই সে পাখিকে ভালোবাসতে শেখে, নদীকে ভালোবাসতে শেখে। গাছ ভালোবাসে, ফুল ভালোবাসে। পাহাড় আর আকাশ দেখে মুগ্ধ হয়। প্রকৃতির অনুষঙ্গকে ভালোবাসে, মানুষকেও ভালোবাসে। একজন মানুষের মধ্যে যদি মানুষের জন্য ভালোবাসা জন্মায়, প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা জন্মায় তাহলে এক জীবনে তার আর কী লাগে? তবে ভাবনার বিষয় হচ্ছে আজকের শিশুরা শিশুসাহিত্য পড়ছে না! স্কুল আর কোচিংয়ের ব্যস্তসূচিতে গল্পের বই পড়ার অবকাশ তাদের হয় না বলে শুনেছি। অথচ বিদেশি চ্যানেলে টম অ্যান্ড জেরি বা ডোরেমন দেখা হচ্ছে নিয়মিত। বাবা-মায়ের পাশে বসে স্টারপ্লাস, স্টার জলসা দেখছে। স্মার্ট ফোনে যুদ্ধ, ধ্বংস আর নির্মমতার ভিডিও গেম খেলছে। শিশুরা শেখে তার বিনোদনের উপকরণ থেকে। তার বিনোদনের উপকরণ কি হবে তা নির্ভর করে বাবা-মায়ের সচেতনতার ওপর। শিশু-কিশোর বয়সে আনন্দ ও কৌতূহল নিয়ে যে বিষয় দেখা হয়, বড় বয়সে সেই বিষয়টিই তার ভাবনার সাম্রাজ্য খুলে দেয়। তার বেড়ে ওঠার শিক্ষায় এসব বিষয়ই প্রভাব ফেলে এবং এটাই স্বাভাবিক।অভিভাবকদের অনেকের ধারণা, গল্পের বই পড়ার মানে হচ্ছে স্কুলের পড়?া থেকে অমনোযোগী হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়া! খুবই ভুল কথা। পড়াশোনা কোন প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। তাছাড়া শুধু স্কুলের বই শিশুকে কোনদিনই জীবন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেয় না, সৃষ্টিশীল করে না। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিশুতোষ বই পড়া অবশ্যই দরকার। বই হতে পারে বিজ্ঞানের, হতে পারে ভ্রমণের, হতে পারে নিরেট আনন্দের। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, শিশুরা আনন্দের মাধ্যমে শিখতে চায়, তাই তাদের জন্য বেশি বেশি শিশুতোষ সাহিত্য তৈরি করা উচিত। লক্ষ্য রাখতে হবে শিশুদের জন্য সৃষ্ট সাহিত্যকর্মে যেন কোনো অসামঞ্জস্য না থাকে।কেন শিশুসাহিত্য প্রয়োজন তা জানার আগে এই সাহিত্য কি তা বোঝা দরকার। সব বড়দের ভিতরে যে ছোটবেলা থাকে, সেই ছোটবেলার জন্যই শিশুসাহিত্যের জন্ম। আরও সহজ করে বললে শিশু ও কিশোর মনের উপযোগী সাহিত্যই শিশু সাহিত্য। শিশুসাহিত্যের বিষয?বৈচিত্র্য অফুরন্ত। এতে থাকে কল্পনা ও রোম্যান্স, জ্ঞান-বুদ্ধির উপস্থাপনা, ছড়া, রূপকথা, এ্যাডভেঞ্চার আর ছোট গল্প। ছোটদের ভাবনা সহজ-সরল। ছোটদের জগত ভিন্ন। তাদের উপযোগী করে সাহিত্য রচিত হয় বলেই সহজেই শিশুরা আকৃষ্ট হয়। এর মাধ্যমে শিশুদের ভাবনার রাজ্যের প্রসারতা বাড়ে। কবি যখন ছোটদের জন্যে লেখেন তখন তিনি যেন শিশুর চোখ দিয়েই দেখেন। কবি ছোট নদীর কথা তুলে ধরেন আর তা পাঠ করে শিশুরা মনের চোখে নদীটাকে দেখে।বয়স যাই হোক না কেন শিশুরা কিন্তু বই পছন্দ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই বছর বয়স থেকেই শিশুরা রঙচঙে ছবিওয়ালা বই পছন্দ করে যাতে মানুষ, পশুপাখি, বাড়ির নানা আসবাবপত্রের ছবি আছে। অন্যের পড়ার সুর শুনতে এবং পাঠরত ব্যক্তির মুখের অভিব্যক্তি উপভোগ করতে সে ভালোবাসে। শিশুরা ভীষণ কৌতূহলী। এরা অবাক বিস্ময়ে চারপাশের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে। এদের মনে ভিড় করে হাজারো প্রশ্ন। ছন্দোময় কবিতা, ঘুমপাড়ানি গান এদের খুব পছন্দ। রঙিন-ঝলমলে ছবিওয়ালা বই এদেরকে আকর্ষণ করে। বইয়ের সেসব ছবি দেখে এরা কল্পনা করে নেয় নিজের মনের মতো কোন কাহিনী। এর মধ্যে দিয়েই এরা প্রবেশ করে গল্প, রূপকথা বা সৃজনশীলতার জগতে। বড়দের অনুকরণে নিজের পছন্দের কোন বই নিয়ে সে পাতার পর পাতা উলটাতে থাকে আর কল্পনা করে নেয় একের পর এক গল্প। তার কল্পনার রাজ্যে সেই থাকে একমাত্র রাজপুত্র।বিশ্ববিখ্যাত রচনা হ্যান্স এন্ডারসনের ফেয়ারি টেলস, এলিস ইন ওয?ান্ডারল্যান্ড, ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রসো, জোনাথন সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলস, রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের ট্রেজার আইল্যান্ড যুগ যুগ ধরে সব দেশের শিশুদের আনন্দ দিয়ে আসছে। আর বাংলাসাহিত্যে শিশুসাহিত্য প্রবেশ করে রবীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমার রায়দের হাত ধরে। কোনো গূঢ় জ্ঞানতত্ত্ব নয়, তাদের হাতে বাংলাসাহিত্যে প্রথম, শিশুদের মনের মতো এবসার্ডিটি আর হিউমারের যথার্থ সমন্বয় ঘটে। শিশু শিক্ষার পুস্তকে যে বস্তুবাদ পড়ে যায় অর্থাৎ আনন্দ সেই বস্তু জুগিয়ে দেবার উদ্দেশ্য তাদের সাহিত্যে প্রকাশ পায়।বাংলাসাহিত্যের প্রবাদ প্রতিম মানুষেরা লিখে চললেন শিশুদের জন্য। স্পষ্ট হয়ে উঠলেন অনেকেই। প্রকাশিত হতে লাগল একের পর এক পত্রিকা। বেরোতে লাগল শিশুদের জন্য রচিত গ্রন্থ। বাঙালি পাঠক পেয়ে গেল রূপকথার সাম্রাজ্য। বাঙালির শিশুসাহিত্যে এসে গেল ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদাদার ঝোলা ইত্যাদির সম্ভার। মনের দিগন্তে তখন রূপকথার মেঘ। শিশুসাহিত্যের এ ধারা ক্রমশ ছড়িয়ে গেল। হেমেন্দ্র প্রসাদের আষাঢ়ে গল্প, যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হাসিরাশি, দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরমার ঝুলি, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ভূতপেতি্ন, উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনির বই, সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল, পাগলা দাশু, অবাক জলপান, নজরুল ইসলামের ঝিঙে ফুল বাংলার শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এ সময?ের উল্লেখযোগ্য পত্র-পত্রিকার মধ্যে মুকুল, প্রকৃতি (১৯০৭), সন্দেশ (১৯১৪), মৌচাক (১৯২১), শিশু সাথী (১৯২২), খোকা খুকু (১৯২৩) উল্লেখযোগ্য। শিশু সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উপেন্দ্র কিশোর রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, সুকুমার রায়, দীনেন্দ্র কুমার রায়, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, হেমেন্দ্র কুমার রায়, সুনির্মল বসু, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী, বিমল ঘোষ, নীহার রঞ্জন গুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বন্দে আলী মিয়া, বুদ্ধদেব বসু, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, অখিল নিয়োগী, লীলা মজুমদার, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, পল্লীকবি জসীমউদ্দিন, কাজী কাদের নেওয়াজ, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই), সুফিয়া কামাল, আবদুল্লাহ আল মূতী শরীফুদ্দিন, সুকুমার বড়ুয়া প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ ছড়াকে মেঘের সঙ্গে তুলনা করে ‘ছেলেভুলানো ছড়া’য় লিখেছিলেন, ‘আমি ছড়াকে মেঘের সঙ্গে তুলনা করিয়াছি। উভয়েই পরিবর্তনশীল, বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত, বায়ুস্রোতে যদৃচ্ছা ভাসমান। দেখিয়া মনে হয় নিরর্থক। ছড়াও কলাবিচারে শাস্ত্রের বাহির, মেঘবিজ্ঞানও শাস্ত্রনিয়মের মধ্যে ভালো করিয়া ধরা দেয় নাই। অথচ জড়জগতে এবং মানবজগতে এ দুই উচ্ছৃঙ্খল অদ্ভুত পদার্থ চিরকাল মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করিয়া আসিতেছে। মেঘে বারিধারায় নামিয়া আসিয়া শিশু-শস্যকে প্রাণদান করিতেছে এবং ছড়াগুলোও স্নেহরসে বিগলিত হইয়া কল্পনাবৃষ্টিতে শিশু-হৃদয়কে উর্বর করিয়া তুলিতেছে।’শিশুসাহিত্যিকের কাজ হচ্ছে শিশুর মনোজগতটাকে রাঙিয়ে দেয়া। আরও কিছু স্বপ্ন তার মধ্যে যুক্ত করে দেয়া। আরও কিছু নতুন জিনিসে তাকে উদ্বুদ্ধ করা। তার দিগন্তটাকে আরও বেশি বিস্তৃত করা। শিশুর একটা অনিন্দ্য সুন্দর জগৎ আছে। একজন শিশু সাহিত্যিককে ওই জগতের বাসিন্দা হতে হয়। শিশু অনেক স্বপ্ন দেখবে, সেটা বাড়িয়ে তুলতে হবে। প্রকৃতির প্রতি তার ভালোবাসা বাড়িয়ে তুলতে হবে, মানুষের প্রতি মমতা বাড়াতে হবে, দেশের প্রতি মায়া বাড়াতে হবে। সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’ ছড়াটি এক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট উদাহরণ- বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর/সবার আমি ছাত্র/নানান ভাবে নতুন জিনিস/শিখছি দিবারাত্র।শিশুসাহিত্য শিশুর মানসিক খাদ্য। এই খাদ্য তার মনকে করে সতেজ, সবল। মুক্ত মন, উদার চিন্তা, গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতা এই সবকে গড়ে তোলে অসামান্য কোনো বই। মা-বাবা ছাড়াও বইয়ের কোনো কোনো চরিত্র হয়ে ওঠে শিশুর আদর্শ নায়ক। নিজস্ব সংস্কৃতির ধারাও শিশুর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আর এভাবেই সে দেশকে ভালোবাসতে শেখে, ভালোবাসতে শেখে সারা পৃথিবীকে। নানা বর্ণের, নানা গোত্রের বিচিত্র সব মানুষের সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যর সঙ্গে সে পরিচিতি লাভ করে আর এভাবেই সে হয়ে ওঠে বিশ্ব নাগরিক।আমরা ক্রমাগত আমাদের শিশুকে কঠিন নিয়মের শৃঙ্খলে বন্দী করে ফেলছি। নিজেদের প্রত্যাশা পূরণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি সন্তানের ঘাড়ে। শিশুর অনুভূতি ও কৌতূহলকে আমলে নিতে চাচ্ছি না। এই বয়সে বই যে তার অন্যান্য খেলার সামগ্রীর মতোই একটা সামগ্রী সেটাও বিশেষ চিন্তা করি না। নাইন ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার পর পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শিশুসাহিত্যের নির্মল ভুবনে আজকের শিশুদের বিচরণের পথ উন্মুক্ত করে দিতেই হবে। মানবিক বোধ নিয়ে বেড়ে উঠার সবরকম জানালা খোলা রাখা জরুরি। শিশুদের স্বপ্ন ও কল্পনার জগৎ, সৃষ্টির পক্ষেই নির্মিত হোক এ ব্যাপারে অন্তত কারোর দ্বিমত থাকার কারণ নেই।