প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কিছু কথা

minhas138_1416768726_1-primary_education
সামসুল ইসলাম টুকু

শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। তারা নিয়ন্ত্রিত হয় সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক। প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্মত করার জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে কিন্তু তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য কোথাও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের অভাব।

শিক্ষকরা ঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে আসেন কি না, পাঠদান করেন কি না, প্রশিক্ষিত শিক্ষকগণ প্রশিক্ষণের জ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে পেঁৗছে দিচ্ছেন কি না, প্রশিক্ষকরা সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন কি না, সহকারী শিক্ষা অফিসার থেকে জেলা শিক্ষা অফিসার পর্যন্ত অফিসারগণ প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকার স্কুল ভিজিট করেন কি না, কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ঠিকমতো হয় কি না, যথাসময়ে যোগ্য ব্যক্তির পদোন্নতি হচ্ছে কি না, বিভিন্ন খাতে সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তার অংশ বিশেষ তুলে ধরাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ৩টি ভাগে বিভক্ত। (১) জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস (২) প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা পিটিআই (৩) উপজেলা রিসোর্স সেন্টার বা ইউআরসি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলো মূলত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার মান উন্নয়ন, উদ্বুদ্ধকরণ, স্কুল ভিজিট করা, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণ সমন্বয় করা, শিক্ষকদের নিয়োগ, পোস্টিং, বদলি এবং শিক্ষকদের চাকরি শেষে পেনশন গ্রাচ্যুইটি নিশ্চিত করা। সারা দেশে তাদের লোকবলও বেশি। সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার থেকে জেলা শিক্ষা অফিসার পর্যন্ত পদোন্নতির ধারাটিও স্বাভাবিক রয়েছে। তাদের এডিপিই ও ডিডিপিই পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু জেলা শিক্ষা অফিসারগণ জেলার সর্বময় কর্তৃত্ব ত্যাগ করে এডিপিই হতে চান না কারণ সেখানে নাকি জব স্যাটিসফ্যাকশন নেই তবে একেবারে পদোন্নতি হয় না তা নয়।

জেলা শিক্ষা অফিসের দায়িত্বের মধ্যে শিক্ষার মান্নোয়ন ও উদ্বুদ্ধকরণ বলতে যা বোঝায় তা হচ্ছে ১০০% শিক্ষার্থীর পাশ নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষকদের ওপর চাপ। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী যদি ফেল করে তবুও। শিক্ষকরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তা করতে বাধ্য হয়। জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ভিজিট করার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকলেও তারা কাছাকাছি বিদ্যালয়গুলো ভিজিট করেন কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষককে ডেকে ভিজিটের কাজ শেষ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস মূলত শিক্ষকদের পোস্টিং, বদলি, পেনশন গ্রাচ্যুইটি প্রভৃতি বিষয়ে অধিক ব্যস্ত থাকেন। কারণ এখানে অন্যায় ঘুষ বাণিজ্য হয়, যা দেখার কেউ নেই। এছাড়াও সরকার বিবিধ খাতসহ বিভিন্ন খাতে যে অর্থ বরাদ্দ হয় সেগুলো যথাযথ ব্যবহার হয় না বলে অভিযোগ আছে।

পিটিআই_ প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

পিটিআই- প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র একটি পুরানো প্রতিষ্ঠান। যা আগে শুরু ট্রেনিং নামে খ্যাত ছিল। বর্তমানে দেশে ৫৫টি পিটিআই কেন্দ্র চালু আছে। নতুন আরো কিছুসংখ্যক পিটিআই কেন্দ্র বৃদ্ধি সরকারের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে। কয়েক যুগ ধরে পিটিআই ইন্সট্রাক্টরগণ ডিপিএড/সিইনএড কোর্সের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ পরিচালনা, একাডেমিক তত্ত্বাবধান ও গবেষণা কাজে সম্পৃক্ত থেকে তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের একাডেমিক ভিত্তি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন এবং মাঠ পর্যায়ে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করছে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ভীষণ গড়িমসি করা হচ্ছে।

১৯৮৮ ও ১৯৯২ সালে পিটিআইর ইন্সট্রাক্টর পদে নিয়োগ পাওয়ার পর অদ্যাবধি তাদের পদোন্নতি দেয়া হয়নি। অথচ একই অধিদপ্তরের অধীনে একই গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত থানা শিক্ষা অফিসারগণ ১৯৯৭ ও ২০০০ সালে নিয়োগ পেয়ে বর্তমানে জেলা শিক্ষা অফিসারের পদোন্নতি পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রেরিত নিয়োগ বিধিতে ৫০৫ জন থানা শিক্ষা অফিসারের বিপরীতে ১৭৪ জনের পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ ৯১৫ জন ইন্সট্রাক্টরের বিপরীতে মাত্র ৫৫ জনের পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়েছে। একই অধিদপ্তরের অধীনে একই গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধরনের বৈষম্য। অথচ পিটিআই ইন্সট্রাক্টরদেরও এডি ও ডিডি হিসেবে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।

প্রায় বছরজুড়ে পিটিআই ইন্সট্রাক্টরগণ প্রাথমিক শিক্ষকদের দেন। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে একাডেমিক সুপার ভিশন জরুরি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তা ভিজিট করার সুযোগ নেই ইন্সট্রাক্টরদের। পিটিআই হচ্ছে প্রশিক্ষণের মাতৃভূমি। কিন্তু উপর মহলের জোর সুপারিশে ও বিভিন্ন অজুহাতে উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টরদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে পিটিআইর প্রশিক্ষণের চেয়ে সমৃদ্ধ অন্যত্র নেই তেমনি এর বিকল্প হয় না।

২০/২৫ বছর যাবৎ পিটিআই ইন্সট্রাক্টরদের পদোন্নতি নেই। অন্যদিকে জেলা শিক্ষা অফিসের মতো ঘুষ বাণিজ্য তাদের হাতে নেই। ফলে তারা প্রচ- হীনম্মন্যতায় ভোগে। এভাবেই হয়তো তাদের চাকরি জীবন শেষ হয়ে যাবে। অথচ দেশের ৫৫টি পিটিআইর অনেকগুলোতে সহকারী সুপার ও সুপারের পদ খালি থাকলেও সেগুলো পূরণ করা হচ্ছে না। এ সকল কারণে ভুক্তভোগী পিটিআই ইন্সট্রাক্টরগণ ভীষণ ক্ষুব্ধ ও হতাশ। ইতোমধ্যে তাদের সমস্যা ও দাবির কথা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন।

পিটিআই এ বিবিধ খাতসহ বিভিন্ন খাতে সরকার অর্থ বরাদ্দ করে। সেগুলো যথাযথ ব্যবহার হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে বাগান করার নামে, এঙ্টারনাল আসার নামে, বাবুর্চির বখশিশের নামে, মসজিদের উন্নয়নের নামে, অতিথি আপ্যায়ন ও খেলাধুলার নামে চাঁদাবাজি করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানের কর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা রিসোর্স সেন্টার বা ইউআরসি

উপজেলা রিসোর্স সেন্টার- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় প্রতি উপজেলাতে ইউআরসি নামে একটি করে প্রতিষ্ঠান আছে। ১৯৯৮ সালে নরওয়ের সাহায্যপুষ্ট হয়ে প্রকল্পের অধীনে এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রতিটি অফিসের জন্য একজন ইন্সট্রাক্টর, একজন সহকারী ইন্সট্রাক্টর, একজন কম্পিউটার অপারেটর ও একজন পিওন পদে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য ছিল মাঠ পর্যায়ে শিক্ষকদের স্বল্পকালীন দান এবং মেধাবী ও নূ্যনতম গ্র্যাজুয়েট শিক্ষকদের বাছাই করে মাস্টার ট্রেইনার সৃষ্টি করা।

২০০৩ সালে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরিও শেষ হয়ে যায়। প্রায় দু’বছর অনেক তদবির ও টাকা পয়সা খরচ করে ২০০৫ সালে তারা চাকরি ফিরে পায় এবং রাজস্ব খাত থেকে তাদের বেতন প্রদান শুরু হয়। ইতোমধ্যে তারা সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্ত হয়। কিন্তু তাদের নিয়োগ বিধিতে যেমন পদোন্নতির বিষয়টি ছিল না, তেমনি প্রশিক্ষণ ভাতা দেবার কথা ছিল না। কিন্তু নিয়ম ভঙ্গ করে এখন সেটা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে মেইনটেনেন্স খরচ বাবদ সরকার যে অর্থ বরাদ্দ করে তা কোন পথে ব্যয় হয় তা কেউ জানে না।

উপজেলা রিসোর্স সেন্টার নামটি শুনলে মনে হবে প্রাথমিক শিক্ষার সকল সম্ভাবনা এখানেই রয়েছে। বাস্তবে কোন সম্ভাবনা বা রিসোর্স এখানে নেই। তাদের বিভিন্ন বিষয়ে ইন্সট্রাক্টর নেই, নিজেদের আইসিটি ল্যাবরেটরি নেই, লাইব্রেরি নেই। তদবির করে ছোটখাটো প্রশিক্ষণের আয়োজন করলেও পিটিআইর সহযোগিতা নিয়েই করতে হয়। নাম সর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানকে পৃথকভাবে রাখতে চাইলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে শক্তিশালী ও মর্যাদা সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় প্রকৃত রিসোর্স সেন্টার বা পিটিআইর অন্তর্ভুক্ত করাই সঠিক কাজ হবে। না হলে পিটিআই ইন্সট্রাক্টর ও ইউআরসি ইন্সট্রাক্টরদের মধ্যে অনাহুত একটা দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

গত কয়েক বছরে প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে বহু মেধাবী ও মাস্টার্স পাস ছেলেমেয়ে। তাদের অনেকেই বড় বড় কর্মকর্তাদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তারপরও তাদের পদোন্নতির কোন সুযোগ নেই। ফলে ভালো চাকরি পেলে অন্যত্র চলে যায়। সরকার ইচ্ছে করলে এই সকল মেধাবী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য উন্নত পরীক্ষার ব্যবস্থা করে বিভাগীয়ভাবে তাদের পদোন্নতি দিতে পারে। এতে করে উচ্চ শিক্ষিত ছেলেমেয়েরাও প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে আগ্রহী হবে ও পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মানও উন্নত হবে।

সর্বোপরি জেলা শিক্ষা অফিস, পিটিআই ও ইউআরসি কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে হাজির হলে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ এদের মধ্যে সমন্বয় না করে তাদের প্রভাবিত হয়ে পৃথক পৃথক সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করেন। আর এসব অনিয়মের কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বঞ্চিতরা কর্মক্ষেত্রে অনুৎসাহিত হয়। শিক্ষা দান বিঘি্নত হয়। এমনকি আন্দোলন পর্যন্ত হয়। তাই কর্মকর্তাদের গ্রেড অনুযায়ী তাদের পদোন্নতি কর্মক্ষেত্র প্রভৃতি ব্যাপারে বিভিন্ন জটিলতা দূর করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ জরুরি বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেন।