প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

edu_15735

কাজী নুসরাত সুলতানা

সম্প্রতি এডুকেশন ওয়াচ-এর ২০০৮ সালের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি ‘বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা, অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শীর্ষক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জনের চেয়ে অপচয় হচ্ছে অনেক বেশী। পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই ঝরে পড়ছে প্রায় অর্ধেক শিশু। ঝরে পড়ার এই উচ্চহার শিক্ষার মানের অভাব, সম্পদের অপচয় এবং পুরো ব্যবস্থার অযোগ্যতাকে নির্দেশ করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৫ সালের পর থেকে ভর্তির হারে স্থবির অবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীর যে সব প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করার কথা, সেগুলোর কিছুটা উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত তা গ্রহণযোগ্য মাত্রার অনেক নিচে রয়েছে’।
বিদ্যালয়শিক্ষার সঙ্গে যাঁরা তৃণমূল থেকে জড়িত, যেমন শিক্ষক, শিক্ষক প্রশিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসক, তাঁদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার এই অবস্থাটি অজানা নয়। আমরা অত্যন্ত দু:ক্ষের সঙ্গেই লক্ষ্য করছিলাম আমাদের এই দূর্ভাগ্য। স্বাধীন, সভ্য, গনতান্ত্রিক দেশসমূহ যেখানে অনেক বছর আগেই ১২ বছরের বিদ্যালয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে ফেলেছে সেখানে আমরা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষাও মানসম্পন্ন ও বাধ্যতামূলক করতে পারলাম না! এ কি উচিত হয়েছে! এ ব্যর্থতার দায় আমরা কেউই এড়াতে পারিনা – না সরকার না জনসাধারণ।
প্রত্যেক সরকারের কাছেই আমাদের প্রত্যাশা থাকে শিক্ষার, প্রথমত: প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে গুণগত নিশ্চিত উন্নয়ন দেখার। সে প্রত্যাশা পুরণ হয়না। উন্নয়ন যে ঘটেনি তা নয়। তবে তা বড়ই সামান্য, বিশেষ করে সময়ের বিচারে। স্বাধীনতা লাভের পর আটত্রিশ বছর পেরিয়েছে; খুব একটা কম সময় নয় কিন্তু! মানুষের কতকগুলো মৌলিক চাহিদা চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদিধরনের শাস্ত্রসমূহ দ্বারা। শিক্ষা তার মধ্যে একটি । আমরা মনে করি শিক্ষা কেবল চাহিদা নয়, চাহিদা পুরণের হাতিয়ারও। উপযুক্ত শিক্ষা পেলে, তা সে প্রতিষ্ঠানিক হোক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিক – আনুষ্ঠানিক হোক অথবা অনানুষ্ঠানিক, একজন নাগরিক অন্যান্য চাহিদা পুরণের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে, রাষ্ট্রটিও উন্নত অবস্থানে পৌঁছবে।। সে জন্যই দেখা যায় প্লেটো থেকে শুরু করে আধুনিক কালের দার্শনিকেরা রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন গুরুত্বের সঙ্গে। আমাদের দেশের সরকারসমূহের কর্তাব্যক্তিরা কি শিক্ষা ক্ষেত্রটির দিকে মনোযোগ দিয়েছেন সেরকম গুরুত্বের সঙ্গে? দেননি; দিলে প্রাথমিক শিক্ষার এরকম বেহাল দশা থাকত না।
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে নিশ্চিত উন্নতি ঘটেছে; এক, ছাত্রভর্তি , দুই, শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা। কিন্তু কেবল এ দুটি বিষয় কোনমতেই প্রাথমিক শিক্ষার মানকে উন্নত করতে পারে না, নিশ্চিত তো নয়ই। আর শিক্ষা মানসম্মত ও উপযুক্ত না হলে তা দেওয়া না দেওয়া সমান হয়। তবে শুধু মানের ব্যাপারে নয়, পরিমানের ব্যাপারেও একটা ‘কিন্তু’ দেখা দিয়েছে। ছাত্রভর্তির হার প্রায় শতভাগে পৌঁছে গিয়েছিল কয়েক বছর আগে। এডুকেশন ওয়াচ-এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে ২০০৫ সালের পর থেকে তাতে স্থবিরতা এসেছে। এর কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। মানের ব্যাপারেও নানা রকম পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে, নানা প্রকল্প-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে; যদিও কার্যকর ফললাভ এখনও বিশেষ ঘটেনি। সে যাই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে না পরিমান না মান, কোন ব্যাপারেই আমরা লক্ষ্য অর্জন করতে পারি নি।
এই যেখানে আমাদের পাঁচ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা সেখানে এবারের শিক্ষানীতিতে তাকে আট বছর মেয়াদে টানার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমান অর্থেরও বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি খুব একটা যৌক্তিক হচ্ছে বলে মেনে নিতে পারছি না। এই না পারার পেছনে নিশ্চয়ই কিছু কারণ রয়েছে। সেগুলো উপস্থাপন করছি এখন।
প্রাথমিক শিক্ষার সময়কালকে পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে যে বিবেচনা থেকে মনে হয় তা হল:
(ক) পাঁচ বছর মেয়াদে শিশুদেরকে এমন কিছু শিখিয়ে ফেলা যায় না যা তাদের পরবর্তী পরিণত জীবনে উন্নততর অবস্থান নিশ্চিত করবে। আট বছর অর্থাৎ ১৪/১৫ বছর বয়সের সময়কালে যে পরিমান তথ্য দেওয়া যাবে বা তত্ত্ব শেখানো যাবে তাতে বরং তা কিছুটা সম্ভব।
(খ) পাঁচ বছর পড়ার পর যদি কেউ পড়া অব্যাহত না রাখে তাহলে এই পাঁচ বছরে তাকে যা শেখানো হয়েছে তার প্রায় সবই সে ভুলে যায়; আবার নিরক্ষরের পর্যায়ে চলে যায়। আট বছর পর্যন্ত অর্থাৎ আরো তিন বছর পড়াতে পারলে সে রকমটা হবে না বলে আশা করা যায়।
বিবেচনাগুলো যে অযৌক্তিক বা অসঙ্গত তা বলব না। আমার আপত্তি অন্যখানে।
(ক) এই অর্জনগুলো নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাস্তরের নাম পাল্টাতে হবে কেন?
প্রকৃতপক্ষে কেবল আট বছর তো নয়, একটা সভ্য, গনতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তো আমাদের নাগরিকদের জন্য   বারো বছরের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা। জানি, আমাদের অর্থবল ও প্রচেষ্টার অভাবে সেটার ধারেকাছেও আমরা এখনও যেতে পারিনি। তাই প্রথমত: পাঁচ বছরের বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও মানসম্মত করার ব্যবস্থা করা হোক, প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন নিশ্চিত করা হোক। এরপর ধাপে ধাপে, একবছর করে হলেও, প্রথমত মাধ্যমিক পর্যন্ত ও পরবর্তীতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা হোক। এর জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এবারে যারা পঞ্চম শ্রেণীর চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠশ্রেণীতে ভর্তির ব্যবস্থা করা হোক ও ধরে রাখা নিশ্চিত করা হোক। এর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও বস্তুগত (বই, কাগজ, পোশাক, দুপুরের খাবার) সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক।
(খ) নাম পাল্টানোর ফলে যে প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হবে তার দায় বহন করা কেন?
এখন যাঁরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তাঁরা ওই স্তরের জন্যই নিযোগপ্রাপ্ত। তাঁদের বেতনকাঠামো মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের থেকে আলাদা, তাঁদের কর্তৃপক্ষও আলাদা। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা যা-ই হোক তাঁরা ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টমশ্রেণীতে পড়ানোর অধিকারী হবেন না। ঐ শ্রেণীগুলোতে পড়ানোর জন্য হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক আনতে হবে অথবা নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। দুটি ক্ষেত্রেই যে নানা রকম প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হবে তা দুটি অধিদপ্তরেরই কর্মকর্তারা ভাল ভাবে জানেন। তবে তাঁরা এ ব্যাপারে কিছু বলবেন বলে মনে হয় না। কারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সমস্যায় পড়লে তাঁদের কি! যেমন বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের ফলে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের চাকরির ক্ষেত্রে উ™ভুত সমস্যায় তাঁদের কিছু এসেযায় নি। ভুগেছেন শিক্ষকেরা, পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা পেতে সমস্যা হওয়ায়। কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে যে কেবল শিক্ষকদের সমস্যা হবে তা নয়। প্রশাসনিক তদারকিতেও সমস্যা হবে। তাছাড়া অবকাঠামো গড়ে তোলার পেছনেও তো বিরাট অঙ্কের অর্থের সংস্থান করতে হবে।
এসব দিক বিবেচনা করে বলতে চাইছি যে, আমাদের মূল উদ্দেশ্য তো ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য অন্তত: বারো বছরের মানসম্মত বিদ্যালয় শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর জন্য কাঠামো পরিবর্তনজনিত দক্ষযজ্ঞে নামার দরকার কি? বরং সেই শ্রম ও অর্থ শিক্ষার্থীদেরকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা ও তাদের জন্য মানসম্মত, জীবনঘনিষ্ঠ, বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করার পেছনে ব্যয় করা হোক না কেন?
তাই বলতে চাই, নামে পরিবর্তন দরকার নেই; কাজে পরিবর্তন আনা হোক। সম্ভব হলে আগামী বছর থেকেই আট বছরের বিদ্যালয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। পরের বছর যদি এদের জন্য নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে না পারা যায় তাহলে হয় কর্মের সংস্থান করা হোক নয় তো কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। দেশের সিংহভাগ অর্থসম্পদ নিযোজিত করা হোক মানবসম্পদ উ্ন্নয়নে। এটিই যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ!

কাজী নুসরাত সুলতানা
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজ, জামালপুর
প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা