ইলিশ ও পয়লা বৈশাখ

পহেলা_বৈশাখের_ভাবনা
কাজী নুসরাত সুলতানা

যত দূর মনে পড়ে সেটা ১৯৫৪ সাল। আমার বয়স ছয় পেরিয়েছে। বাবা তখন ফরিদপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। আমি প্রথম যেদিন সেই বাড়িটায় গেলাম, যে বাড়িটা আমাদের থাকার জন্য বরাদ্দ ছিল, আমার প্রথম কাজ হয়েছিল সারা বাড়িটা ঘুরে দেখা। ঘুরতে ঘুরতে ভেতরের বারান্দায় এলাম। বেশ চওড়া বারান্দা। বারান্দা থেকে নেমেছে অনেকগুলো ধাপের ঁিসড়ি, তারপর বড়সড় উঠোন। উঠোনের পরে একটা পুকুর, ওপারের গাছগুলোকে ছোট ছোটই মনে হয়েছিল; তার মানে পুকুরটাও বড়ই ছিল। ডানদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম পাকা বারান্দাসহ একটা লম্বা স্থাপনা। পরে দেখেছিলাম ওটাতে তিনটে ঘর ছিল, দুটো রান্নঘর আর একটা ভাঁড়ার। বাঁদিকে চোখ ফেরাতেই দেখি বেড়ার ফাঁক দিয়ে কি যেন নড়ছে, আর সঙ্গে সঙ্গেই শুনলাম একটি কন্ঠস্বর,“এই শোন!” কাছে গেলাম, পরিচয় হোলো; একজন বলল: ‘আমি ছোড়্দি আর ও বড়্দি। পেলাম দুটি দিদি; আমার বড়দি আর ছোড়দি। বেড়ায় যে দুয়ারটি ছিল সেটি খোলা হোলো, শুরু হোলো অবাধ আসা যাওয়া।
ভনিতা হোলো, এবার আসি আসল কথায়। কিন্তু আসল কথার আগেও কিছু কথা আছে; কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় ‘সন্ধ্যে বেলায় দীপ জ¦ালার আগে সকাল বেলার সলতে পাকানো’-এর মত। একটা বেলার স্মৃতি, আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি ও বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি, বড়দি দাঁড়িয়ে আছে রান্না ঘরের বারান্দায় একটা থাম দু’হাতে জড়িয়ে ধরে; কাকাবাবু বাজারে যাবেন, কথা বলছেন কাকিমার সঙ্গে। বড়দি বলে উঠল, “বাবা জোড়া ইলিশ এনো!”
কি জন্য বড়দি জোড়া ইলিশ আনতে বলেছিল তা হয়তো তখন জানতাম; কিন্তু এখন মনে নেই। তবে কিছু তথ্য আর ঘটনা মিলিয়ে আন্দাজ করতে পারি। ঘটনাটা এরকম: মা বলেছেন আমরা যখন পিরোজপুরে ছিলাম তখন ভরা বর্ষা; ফরিদপুরে এসেছি বর্ষাৃর শেষাশেষি। ফরিদপুরে  ছিলাম মাত্র তিনমাস;  মনে হয় অগাস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর। তথ্যটি এরকম: আমাদের সনাতন ধর্মের অনুসারীরা সাধারণত: বড় বড় পুজাপার্বনে বিশেষ করে ইলিশমাছ এনে থাকেন, সুলক্ষণ হিসেবে। অক্টোবর মাসে দুর্গাপুজা হয়। বড়দি নিশ্চয়ই তাহলে দুর্গাপুজা উপলক্ষ্যেই জোড়াইলিশ আনতে বলেছিল।
ইলিশ মাছ খেতে পছন্দ করে না এমন বাঙ্গালী মনে হয় খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে; স্বাস্থ্যগত কারণ হলে অবশ্য অন্য কথা! আমাদের লোকগীতিতেও রয়েছে ইলিশের বন্দনা:
‘ছাওয়াল কান্দাইনা মাছ, জামাই ভুলাইনা মাছ
রান্ধুনি পাগল করা মাছ ইলশারে।’
বাঙ্গালীর রান্নাঘরে ইলিশ দিয়ে তৈরী হওয়া পদের অভাব নেই। ভাজা, শুধু পেঁয়াজ কাঁচামরিচ আর সামান্য করে হলুদ- মরিচ দিয়ে মাখোমাখো, যে কোন শবজি দিয়ে ঝোল, সর্ষে দিয়ে, আনারস দিয়ে ; যে কোন রকমই হোক, দারুন মজা। রান্নায়ও কোন ঝামেলা নেই, মেখেটেখে বসিয়ে দিলেই হয়ে যায় ভীষণ স্বাদের পদ। আমাদের দাদার বাড়ির ঐতিহ্যে আরো দুটো বিশেষ পদ রয়েছে। তার একটা হল সেদ্ধ; পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর সামান্য একটু আদা দিয়ে সেদ্ধ আর নামানোর আগে একটু খানিক ঘি। ইলিশ মাছের রান্নায় আমরা হলুদ আর মরিচবাটা ছাড়া আর কিছু দেই না তার সুগন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে বলে; কিন্তু সেদ্ধতে একটু আদাবাটা দেওয়া হয়। যদিও সেই গানটায় বলা হয়েছে,  ‘চিতলমাছে মেথীর গঁড়ো ইলিশমাছে আদা, তুমি দিও না দিও না’। অন্য পদে দেই না ঠিকই,  কিন্তু সেদ্ধতে শুধুই আদা দেই আমরা। সে যাই হোক, আরেকটা পদ হল মাছ-ভাত। এই পদটি অনেক জায়গায় সাদা করে রান্না করা হয়, নামের বেলাতেও বলা হয় ইলিশ-পোলাউ। কিন্তু আমাদের বাড়িতে হলুদ-মরিচ দিয়েই রান্না করা হয়, বলা হয মাছ-ভাত। যেদিনগুলোতে মাছ-ভাত হত সেদিনগুলোতে বাড়িতে থাকত উৎসবের আবহ। বেশ বড় মাছটাই আসত। কাটা হত খুব যতœ করে, পিঠের কালো দাগ ধরে ধরে গাদা-পেটি আলাদা করা হত, যাতে মাঝের কাঁটাটা গাদা আর পেটিতে সমান ভাগে পড়ে; তা না হলে মাছ খুলে গিয়ে টুকরোর আকার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পেটির লেজার দিকে একটা তিনকোনা টুকরো বেরুত যেটাতে খুব তেল থাকত। গাদার বড় টুকরোগুলো ভাজা হত, মাছ-ভাতের সাথে প্রথম পদ হিসেবে খাওয়ার জন্য; আমরা পেটির টুকরো ভাজি না। আমরা মনে করি ওতে পেটির বারোটা বাজিয়ে ফেলা হয়। ভাজার ব্যাপারেও আমাদের ধরনটা একটু অন্য রকম। আমরা কড়কড়ে করে ইলিশমাছের ভাজা করি না। বাবার তা একেবারেই অপছন্দ ছিল। বাবার মতে ইলিশমাছ বেশীক্ষণ চুলোয় রাখার দরকার পড়ে না; চট করেই হয়ে যায়। আর ভাজার বেলায় বেশীক্ষণ রাখলে তো তেলগুলো বেরিয়ে মাছটা চিমসে হয়ে যায়। তাই আমাদের বাড়িতে এপিঠওপিঠ হালকা লালচে হলেই তুলে রেখে সেই তেলে পেঁয়াজ ভেজে তেলসহ মাছের টুকরোর ওপরে ছড়িয়ে দিয়ে পরিবেশন করা হত। এবারে আসি মাছ-ভাতের ব্যাপারে। পেটি আর গাদার বড় টুকরোগুলো  দিয়ে মাছ-ভাতটা রান্না হত। বাকী কল্লা, নেজা, ছোট ছোট গাদা পেটি এগুলো দিয়ে আচারের তেল দিয়ে আলু আর বেগুনের সাথে একটা তরকারি রান্না করা হত শেষ পদ হিসেবে খাওয়ার জন্য।
আমার নবীন পাঠকেরা নিশ্চয়ই খুব অবাক হচ্ছে, ভাবছে ‘ইলিশমাছের গাদা, পেটি, এসব আবার কি! আমরা তো বাড়িতে দেখছি, ইন্টারনেটের ছবিগুলোতেও দেখি এক একটা লম্বাটে চোখের মত টুকরা হয় ইলিশমাছের।’ তাই বটে! কিন্তু আমাদের কালে, এমন কি আমাদের সন্তানদের ছোট বেলাতেও ইলিশমাছের গাদাপেটি আলাদা করা সম্ভব ছিল; এখন আর হয় না। শুধু তাই নয়, ইন্টারনেটের ছবিতে যেমন বড় ফাঁকের কাঁটা সর্বস্ব পেটিসমৃদ্ধ টুকরো দেখা যায় তেমন হত না। পেটিতে কাঁটার সাথে বেশ খানিকটা পুরু পদার্থ থাকত। কেন? সেটা একটা বড় প্রশ্ন বটে। তবে একটু চোখকান খোলা রেখে বাজারে গেলে আর ফিরে এসে একটু চিন্তা করলেই এর উত্তর পেয়ে যাবে। হ্যাঁ, এখন আর তত বড় ইলিশ উঠছে না বাজারে; তাই গাদা-পেটি একসাথে করে টুকরো করা হচ্ছে এখন। তাছাড়া বড় বড় ডিমসহ ইলিশও ধরা হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে; সেসব মাছের পেটের দিকটা কাঁটা সর্বস্ব তো হবেই। এসবের কারণ কি? দুটো কারণ বোধহয় চিহ্নিত করা যায়।
এক: নিয়ম না মানা
দুই: লোভ করা
দুটো নিয়মের কথা তুলতে চাই; একটা পুরোনো, আরেকটা নতুন। পুরোনো নিয়মটি আমাদের সনাতন ধর্মের মুনিঋষিদের অর্থাৎ এই অঞ্চলের প্রাচীনতর জনগোষ্ঠির মনীষার তৈরী করা। তাঁরা বিধান দিয়েছিলেন দুর্গাপুজার পর থেকে সরস্বতীপুজা পর্যন্ত ইলিশমাছ খাওয়া চলবে না। এ নিয়ম তাঁরা এমনিতে দেননি;  যথেষ্ট যৌক্তিক কারণেই দিয়েছিলেন। এরকম আরো বহু বিধানই তাঁরা দিয়েছিলেন নানা বিষয়ে। এসব বিধান তাঁরা একটি বড় সত্যের উপর ভিত্তি করে তৈরী করেছিলেন। আর তা হল, প্রকৃতির প্রতি বন্ধুতা রাখতে হবে বৈরিতা নয়। প্রাচীনকালের মুনিঋষিরা তাঁদের সম্যকজ্ঞানের মাধ্যমে জেনেছিলেন এই পৃথিবীতে  প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে চলাটা সুন্দর ও সার্থক জীবন যাপনের জন্য একান্ত প্রয়োজন; এর অন্যথা হলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবে। বছরের খানিকটা সময় ইলিশ খাওয়া বন্ধ রাখার বিধান দেওয়ার কারণটি অবশ্যই ইলিশের বংশবৃদ্ধি যথেষ্ট ও অব্যহত রাখার স্বার্থে। ঐ চারটি মাস ইলিশের বড় হওয়া ও ডিম ছাড়ার বিশেষ সময় বলেই জানা ছিল। ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার কারণটিও সহজেই অনুমেয়; আমাদের এ অঞ্চলের লোক যথেষ্ট ধর্মভীরু তাই নিয়ম মানানো সহজ হবে। খাদ্যাভ্যাস গঠনের ক্ষেত্রে এরকম বিধান তাঁরা আরও দিয়েছেন, যেমন, সরস্বতী পুজার আগে বরই বা কুল না খাওয়া; অন্য কারণ ছাড়াও মূল কারণটা হল ঐ সময়ের আগে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত কুল যথেষ্ট পরিণত হয় না সতেজ বংশবৃদ্ধির স্বার্থে।
নতুন নিয়মটি আমাদের বর্তমান সরকারের করা। সরকারের মৎস অধিদপ্তর পয়লা নভেম্বর থেকে তিরিশে জুন পর্যন্ত সময়কালের, অর্থাৎ এই আট মাসের মধ্যে ইলিশ শিকারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই সময়ের মধ্যে ১০ ইঞ্চির চেয়ে ছোট ইলিশ ধরা, বিক্রি করা, মজুদ করা বা পরিবহন করা নিষিদ্ধ। এটি অবশ্যই ইলিশের সুষ্ঠু বংশবৃদ্ধি ও বিস্তারের স্বার্থে। এই নিয়মটি ঠিকঠাক মত মানানো গেলে আমরা যথেষ্ট বড় ও অনেক বেশী ইলিশ পাব সন্দেহ নেই।
কিন্তু সমস্যা হল ইদানিং আর কোন নিয়ম মানানো যাচ্ছে না কাউকে দিয়ে। এখন আমরা বোধহয় সেই গানটিকে স্মরণ রাখছি, ‘নিয়ম ভাঙ্গার নিয়ম এ যে’! ধর্মীয় নিয়মের কথা উল্লেখ করলে বাংলাদেশের সংখ্যা গরিষ্ঠদের পক্ষ থেকে বলা হতে পারে, ‘ওটা তো হিন্দুদের, আমাদেরকে কেন মানতে হবে! তা ছাড়া আদ্দি কালের বদ্দিদের কথা একালে একেবারেই অচল’। সেটা কিন্তু আদপেও ঠিক নয়। ইসলামধর্মের অনুসারীদেরকে যেমন দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করার নির্দেশনা দেওয়া আছে তেমনি হিন্দুধর্মেও পারমার্থিক মোক্ষ লাভের পথ প্রদর্শনের সাথে সাথে ইহজাগতিক মঙ্গল লাভের দিকনির্দেশনাও রয়েছে। এবং সেটা অবশ্যই প্রকৃতিকে বা প্রাকৃতিক নিয়মকে গুরুত্বের সাথে মান্য করার মাধ্যমে, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে প্রকৃতির সহযোগিতা গ্রহণের মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, হিন্দুধর্মের অনুসারীরা এই অঞ্চলে বহু প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করছেন বলে এর প্রকৃতিকে খুব ভালভাবে চিনেছেন, বুঝেছেন। তাই তাঁদের মনীষীরা প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত বিষয়ে যেসব বিধান দিয়েছেন সেগুলো কার্যকারিতার বিচারে যুগের ধোপে টিকে গেছে। সুতরাং তাঁরা যখন বলেছেন বছরের বেশ কিছুটা সময় ইলিশ মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে তখন তাতে মানুষের জন্য উপকার আছে বলেই বলেছেন, এটা আমাদের মেনে নিতেই হবে। এই বিষয়টির উপর ভিত্তি করে এবং বর্তমানের প্রকৃতিগত অবস্থা বিবেচনা করে সরকার সঙ্গত ভাবেই আরো কিছুটা বাড়তি সময় অর্থাৎ নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ১০ ইঞ্চির চেয়ে ছোট ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা মানছি না; না ধর্মীয় নির্দেশ, না সরকারি নির্দেশ। জানিনা আমাদের বেশীরভাগ মানুষ কেন এমন নিয়ম বা আইন অমান্যকারী মানসিকতা নিয়ে বড় হয়ে উঠেছি!
এবারে লোভ করার কথায় আসি। আমরা যদি ইলিশ না কিনতে চাইতাম তাহলে তো বাজারে সরবরাহ হত না; বাজারে সরবরাহের সুযোগ না থাকলে তো ব্যবসায়ীরা জেলেদেরকে প্রলুব্ধ করতেন না দাদন দিয়ে; দাদনের টাকা ফেরত দেওয়ার দায় না থাকলে তো জেলেরা জাটকা ধরতেন না আইন অমান্য করে। সুতরাং দোষটা আমাদের অর্থাৎ ভোক্তাদের লোভের, বিশেষ করে ধনবান ভোক্তাদের, যাঁরা চড়াদামে হলেও ইলিশ কিনবেনই। বরং বলব এটা দোষ নয়, অপরাধ; আইন অমান্য করার অপরাধ। সুতরাং কেবল আহরণ, বিপনন, মজুদকরণ, ও পরিবহন নয় ক্রয়করণকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিৎ। জেলেরাও লোভের জন্যই জাটকা ধরে থাকেন, বেশী টাকার লোভে। তবে এটাকে ঠিক লোভ না বলে অভাবের তাড়না বলা বোধ হয় ভাল হয়। তাঁদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা যথাযথ থাকলে এ পথে পা বাড়াবেন না। লোভ ভোক্তাদেরই বটে। আমাদের লোভের কারণেই ইলিশসম্পদ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আমাদের বাড়িতে আমরা ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি ইলিশ বর্ষাকালের মাছ; আমাদের বাড়িতে বর্ষাকালেই ইলিশ আসত। আমরা যারা ইদানিং সারা বছরই ইলিশ খেতে চাইছি, তারা যদি লোভ সংবরণ করে কেবল জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত খাওয়া মানসিকতা আর অভ্যাস গড়ে তুলি তাহলে ইলিশের প্রতি ন্যায় করা হয়; নয়ন জুড়ানো মাপের, রসনা জুড়ানো স্বাদের ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেয়।
এবারে আসি পয়লা বৈশাখ প্রসঙ্গে। একটা সময় যদিও অগ্রহায়ণ ছিল আমাদের বছরের প্রথম মাস, তবে বহু দিন ধরেই বৈশাখ থেকে বছর শুরুর রীতি চালু আছে। আর তাই বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ আমরা উৎসব করে যাপন করে আসছি। তবে তার ঠিক আগের দিনটি অর্থাৎ চৈত্রমাসের শেষদিনটিও জনজীবনের জন্য একটি বিশেষ দিন। এই দিনটিকে বলা হয় চৈত্র সংক্রান্তি। এই দিনের ধর্মীয় বা সামাজিক অন্য কোন মাহাত্ম আছে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু দামে বেশ ছাড় দিয়ে জিনিসপত্র যে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা আর বিক্রির শেষে পুরোনো বছরের হিসাবের খাতা যে বন্ধ করেন সেটা উল্লেখ করতে চাই। বৈশাখের প্রথম দিনের সকাল থেকে খোলা হয় নতুন হিসাবের খাতা, বলা হয় ‘হালখাতা’ অর্থাৎ বর্তমান খাতা। অনেক ক্ষেত্রে রীতিমত নিমন্ত্রণ পত্র বিতরণ করে আয়োজন করা হয় হালখাতার, আপ্যায়ন করা হয় নানা রকম মিষ্টি দিয়ে। তাছাড়া মেলা বসে গ্রামে-গঞ্জে নানা পসরা আর আনন্দ-আয়োজন নিয়ে; সারাটা দিনই থাকে উৎসবের আবহ। ঢাকাশহরের জীবনে পয়লা বৈশাখের উৎসবে নতুন একটা মাত্রা যোগ করে ‘ছায়ানট’ নামক সংস্থাটি সূর্যওঠা ভোরে রমনার বাগানের বটমূলে সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে সেই ষাটের দশক থেকে। ইদানিং চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উৎসবের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে।
কিন্তু পয়লা বৈশাখের উৎসবের, আনন্দ-আয়োজনের অনুসঙ্গ হিসেবে পান্তাইলিশের তো কোন দেখা পাই না ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে! গত বেশ কয়েকটা বছর ধরে রমনায় গান শুনতে গিয়ে দেখছি পথের ধারে ধারে পান্তাইলিশের দোকান। এমন তো আগে ছিল না। এই ঘটনাটির মাধ্যমে অর্থাৎ পান্তা-ইলিশ খাওয়ানোর  আয়োজনে ও খাওয়ার বিস্তরণ বা বিস্ফোরণে দুটি অন্যায় সংঘটিত হচ্ছে। প্রথমে খাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলি। পান্তাভাত আমাদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠির একটি সহজ ও স্বাভাবিক চিরায়ত প্রায় নিত্যদিনের খাবার; রাতে রান্না করা বাড়তি ভাতে পানি দিয়ে রেখে দেওয়া হয় সংরক্ষণের উপায় হিসেবে। সাধারণত আমাদের গ্রামের মানুষেরা জলখাবার বা নাস্তা হিসেবে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর নুন দিয়ে এই পান্তাভাত খেয়ে কাজে বেরিয়ে যান সাত-সকালে। শহরের মানুষের, বিশেষ করে একটু উঁচুতলার মানুষের এর সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তাঁদের সকালের জলখাবারের ধরণধারন আলাদা। যাঁরা ভাত খেয়ে বেরুতে চান তাঁরা গরম ভাত খেয়েই বের হন। সুতরাং সেইসব মানুষদের পক্ষে পয়লা বৈশাখের উৎসবের অনুসঙ্গ হিসেবে অর্থাৎ রঙ্গ করে পান্তাভাত খাওয়াটা আমাদের শ্রমজীবি মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা নয়, একটা প্রছন্ন উপহাস করে ফেলা হয় বলে আমার মনে হয়; এটা অন্যায় হচ্ছে বলেও মনে হয়। তার উপর সেই সাথে ইলিশভাজা! সেটা তো কিছুতেই চলতে পারে না। বৈশাখ ইলিশের মরসুম নয়; পাওয়া গেলেও দাম হয় ভীষণ চড়া। সাধারণ মানুষের পক্ষে কেনা দুষ্কর, অসম্ভব বললেও অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং কিছু মানুষের অযৌক্তিক একটি কাজকে বাঙ্গালীর সংস্কৃতির অঙ্গ বলে চালিয়ে যাওয়াকে মেনে নিতে পারছি না; এটাকে অপসংস্কৃতি বলতে বাধ্য হচ্ছি। অপরাধও বলতে চাইছি। কারণ তাঁরা খেতে চাইছেন বলেই ওঁরা সরবরাহ করছেন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে। অর্থাৎ একদলকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে প্ররোচিত করে অন্যদল অপরাধ সংঘটিত করছেন।
এবারে খাওয়ানোর ব্যাপারে আসি। পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রথা তৈরী করে যাঁরা সেটাকে সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের অঙ্গ বলে চালিয়ে দিলেন হঠাৎ করে, আমার মতে তাঁরাই বড় অপরাধী। তাঁরা চতুর ব্যবসায়ীও বটে। হুজুগ তুলে ইলিশের দাম দিলেন চড়িয়ে, আয়োজন করে পসরা সাজিয়ে খাওয়ার মুখ দিলেন দারুন ভাবে বাড়িয়ে। হুজুগে জাতি যে আমরা; একজন যেদিকে যায় ভেড়ার পালের মত সেদিকেই ছুটি যে আমরা! সেটা তাঁদের ভালই জানা আছে।  যদি বলি, ‘বৈশাখে ইলিশ খাওয়াচ্ছেন কি করে । এটা তো মরসুম নয়, পাওয়া তো যাবার কথা নয়। তাছাড়া নিষেধাজ্ঞাও তো রয়েছে!’ তাঁরা বলবেন, ‘তোলাচ্ছি না তো! এগুলো তো গত মরসুমের মাছ।’ অর্থাৎ হিম-ভাঁড়ারিদেরও লাভের ব্যবস্থা করে রেখেছেন তাঁরা। কিন্তু ‘তোলাচ্ছি না’ বল্লেও আসলে তোলানো হচ্ছে। এই তো গত ষোলই ফেব্রয়ারির ‘সংবাদ’-এর খবরে রয়েছে: ‘সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শরীয়তপুরের পদ্মা নদীর সুরেশ^র থেকে মেঘনার জালালপুর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী অবাধে চলছে জাটকা নিধনের মহা উৎসব।’ প্রচূর আসছেও হাটে-বাজারে, ফেরিওয়ালাদের মাথায় মাথায়। কেন হচ্ছে এখন এমন! আমাদের ছোটকাল থেকে যুবকাল হয়ে প্রৌঢ়কাল, কখনওই তো দেখিনি এমন। এটা কি তাঁদের খাওয়ানোর অত্যুগ্র আয়েজনের প্রভাবে নয়? চাহিদা-সরবরাহ, অর্থনীতির এই স্বাভাবিক নিয়ম এখানে কাজ করছে বটে কিন্তু ‘চাহিদা’টিকে এখানে কি অস্বাভাবিক ভাবে তৈরী করা হচ্ছে না নিয়ম আর আইনকে অমান্য করে? এতে কি তাঁরা অপরাধী সাব্যস্ত হচ্ছেন না? আমার মতে হচ্ছেন বটে। তা পয়লা বৈশাখে আপ্যায়ণ করে খাওয়াতেই যদি হয় তো ফল দিয়ে করুন না। বৈশাখ তো গ্রীষ্মকালের মাস, আর এই কালটি তো আমাদের নানা রকম, প্রচূর, রসাল ফলের কাল। চিঁড়ে-দই আর ফল দিয়ে ফলার খাওয়ান না। অথবা বৈশাখী করুন না; অর্থাৎ আমাদের গ্রাম বাংলায় যে প্রচলিত আছে বৈশাখে ছেলের মায়েদের কাঁঠাল  ভাঙ্গতে হয় সেই প্রথাকে বাঁচিয়ে তুলুন না(অবশ্য কেবল ছেলের মাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, মেয়ের মাকে নয়, সেটা আবার মানতে পারব না; বরং যে কোন সন্তানবতীকে দিয়েই ভাঙ্গাতে পারেন)। আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল দিয়েও তো পান্তা খাওয়া হয়, নয় কি? কিন্তু ইলিশ! নৈব নৈব চ।
কি করে হবে এ অবস্থার পরিবর্তন! সামাজিক প্রতিরোধই মনে হয় এর একমাত্র সমাধান। তারও আগে আমাদেরকে বুঝতে হবে প্রকৃতিতে সৃষ্ট প্রতিটি বস্তুই আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদেরই সাবলীল অস্তিত্ব চলমান রাখার স্বার্থে একান্ত জরুরি। এটা সম্ভব যদি প্রকৃতিকে তার আপন গতিতে চলতে দেই তাহলেই, তস্করের মত তার সম্পদকে লুটেপুটে নিয়ে লন্ডভন্ড করে না দেই তাহলেই। ইলিশমাছ আমাদের প্রিয় একটি মাছ, আমরা অবশ্যই সেটা খাব, প্রাণের সাধ মিটিয়ে খাব; কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যাতে সাধ মিটিয়ে খেতে পারে সে বিষয়টিও তো দেখতে হবে। আমরা যদি ইলিশের বংশ বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করি তাহলে কি সেটা আর সম্ভব হবে তেমন ভাবে! এখনই তো তার নমুনা দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া ইলিশগুলো মিঠাপানিতে যথেষ্টদিন থাকতে পারছে না বলে স্বাদে আর ঘ্রাণেও পার্থক্য হয়ে গেছে প্রচূর।
সুতরাং বলতে চাই পয়লা বৈশাখকে উপলক্ষ্য করে ইলিশ খাওয়ার যে অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে, আসুন সমবেত ভাবে তা ঠেকিয়ে দেই। আসুন আমরা আইন ও নিয়ম মান্যকারী মানুষে পরিনত হই। ইলিশের আর মানুষের মঙ্গলের কথা বিবেচনা করে, অনেক গবেষণা আর পর্যবেক্ষণ করে মৎসবিজ্ঞানীরা যে সুপারিশ করেছেন এবং তার উপর ভিত্তি করে আমাদের মৎস অধিদপ্তর যে  আইন করেছে তা মেনে চলি। শপথ নেই পয়লা নভেম্বর থেকে ত্রিশে জুন পর্যন্ত ইলিশমাছ খাব না। সঙ্গত কারণ থাকলে যে আমরা এক হয়ে অনেক কিছুই করে ফেলতে পারি তার উদাহরণের তো অভাব নেই আমাদের!

কাজী নুসরাত সুলতানা
অধ্যাপক, দর্শন
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজ, জামালপুর