ঝরে পড়া রোধে সড়ক যোগাযোগ

shorok
প্রেমানন্দ চক্রবত্তর্ী

দুর্গম যোগাযোগের কারণে প্রতি বছর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অনেক শিশু ঝরে পড়ে। হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার হাওর এলাকার বিদ্যালয়গামী শিশুদের পায়ে হেঁটে সব ঋতুতে বিদ্যালয়ে যাবার সুযোগ হলো না! উজানের পাহাড়ি ঢলে আসা পলি মাটিতে নদ-নদীর মতোই হাওর বক্ষ ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে যাওয়ায় এখন এসব এলাকায় সড়ক নির্মাণ কোনো কঠিন কাজ নয়। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা।

যোগাযোগ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। দুর্গম এলাকায় (পাহাড়ি এলাকা ও হাওর এলাকা) শিশু-কিশোরদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই একটা বাধা হিসেবে কাজ করে যোগাযোগ। এখানে হাওর এলাকার যোগাযোগের সমস্যার কথাই বলছি। বর্ষায় সাগর দ্বীপের মতো গ্রামগুলো হাওরে ভাসতে থাকে। এক পাড়ার সঙ্গে আরেক পাড়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় শিশুরা নিজ গৃহে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ফলে এ সময়ে পড়াশোনায় ক্ষতি হয়, অনেকে লেখাপড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। নৌকাডুবির ভয়ে অনেক অভিভাবক সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না। বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র উপস্থিতি হ্রাস পায়। বর্ষাকাল হাওর এলাকার জনজীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে। এ সময় জীবন-জীবিকার স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য অনেকাংশেই স্থবির হয়ে পড়ে। এজন্যই দুর্গম হাওর এলাকার মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, অর্থ-বিত্তে পশ্চাদপদ। হাওর এলাকার মানুষের শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি তথা উন্নয়ন, অগ্রগতির পথে জগদ্দল পাথরের মতো অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে যোগাযোগব্যবস্থা। উপজেলার সঙ্গে ইউনিয়নগুলোর, আর আন্তঃ ইউনিয়ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হলেই সেসব বাধা কেটে যাবে। সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন-অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।

যেমন আজমিরীগঞ্জ উপজেলার সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একমাত্র কলেজ আজমিরীগঞ্জ মহাবিদ্যালয়। কিন্তু এ উপজেলার ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে সব ঋতুতে চলাচলযোগ্য সড়ক যোগাযোগ না থাকায় শিক্ষাথর্ীদের শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়। বছরের প্রায় ৭/৮ মাস নৌপথে যোগাযোগ করতে অনেক টাকা ভাড়া গুনতে হয় বলে অনেকে সামর্থ্য না থাকায় লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে এ বাধা দূর করতে হবে।

যুগ যুগ ধরে হাওর এলাকার জনপদসমূহে সড়ক নির্মাণের জন্য অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে রাস্তায় রাস্তায় মাটি ভরাট করা হয়, বর্ষার জলের ঢেউয়ে সে মাটি ধুয়ে নিয়ে যায়। আবার মাটি ভরাট হয়, আবার ধুয়ে নিয়ে যায় বর্ষায় জলের ঢেউয়ে। এ যেন চিরন্তন নিয়ম!

সরকারি টাকা জলে ঢালা হচ্ছে_ এ দৃশ্য জনগণ বরাবরই দেখে আসছে। অনেকে আফসোস করে বলে থাকে_ শুকনো মৌসুমে খোলা মাঠ দিয়েও তো হেঁটে চলা যায়, তাহলে ৪/৫ মাসের রাস্তা কার জন্যে? সড়ক তৈরি হবে সব ঋতুতে চলার জন্য ঋষড়ড়ফ খবাবষ-এর ওপরে দু’পাশে চৎড়ঃবপঃরড়হসহ, যাতে জলের ঢেউয়ে মাটি ক্ষয় করতে না পারে বা রাস্তা ভেঙে না যায়। ঢেউয়ের হাত থেকে সড়ক রক্ষার পরিকল্পনা করেই রাস্তার জন্য ভাটি এলাকায় প্রকল্প মঞ্জুরী দেয়া, অন্যথায় বরাদ্দ বন্ধ করে দেয়া_ এ দুইয়ের একটি পথ বেছে নেয়া অত্যাবশ্যক।

বর্ষায় জলের ঢেউ থেকে রাস্তার ভাঙন ঠেকানোর জন্য রাস্তা নির্মাণের পরপরই যেসব প্রতিরক্ষামূলক টেকসই ও মজবুত ব্যবস্থা আছে তা নেয়া হলে রাস্তা তো ভাঙবার কথা নয়। রাস্তার দু’পাশের মাটি রক্ষার জন্য কংক্রিট বিছিয়ে তারের নেট দিয়ে আটকানোও একটি সহজ সুলভ প্রযুক্তি, অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম একটি ব্যবস্থা। একটি রাস্তার মাটি ভরাটের সঙ্গে সঙ্গে ড্রেসিং করে কংক্রিট-তারের নেট দিয়ে আটকানোর ব্যবস্থা করা হলে রাস্তাগুলোর গড় আয়ু কয়েক বছর বেড়ে যাবে, অদূর ভবিষ্যতে স্থায়ী হয়ে যাবে, জনগণের তাই ধারণা।

সব ঋতুতে চলাচলযোগ্য রাস্তা হয়ে গেলে শিশুরা স্কুলে যেতে আগ্রহ হারাবে না। সাইকেল, রিকশা, টেম্পো, বাসে চলাচল করে সময় সাশ্রয় হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য লাভদায়ক হবে। কৃষক, মৎস্যজীবী তাঁদের পণ্যের উপযুক্ত মূল্য পাবেন। সবচেয়ে লাভ গরিবের পায়ে হেঁটে চলার সুযোগ হলে নৌকায় ভ্রমণের খরচটা বেঁচে যাবে। তাদের সন্তানদের স্কুলে বিশেষত প্রাইমারি স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার হ্রাস পাবে।

আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ