শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে যা জরুরি

teacher-in-classroom-8043
মো. আবদুর রহিম

বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকগণ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভাবে খুবই অবহেলিত। কাগজের পাতায় ও বক্তৃতায় তাঁদেরকে যতটুকু মূল্যায়ন করা হয়, আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বেলায় তাঁরা এর সিকি পরিমাণও পান না। গুরুত্বের দিক দিয়ে বিচার করলে তাদের চাকরি অন্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চেয়ে তিনগুণ আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়া উচিত। কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ নিজ নিজ বেতনস্কেলের বাড়িভাড়া ৪০ থেকে ৬০ ভাগ, চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা, প্রতি বছর একটি করে ইনক্রিমেন্ট ও উৎসবভাতা ১০০ ভাগ পান। অথচ জাতির মেরুদণ্ড তৈরির কারিগর বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকগণ প্রতিমাসে বাড়িভাড়া ১০০ টাকা, চিকিৎসাভাতা ১৫০ টাকা, আজীবন একটি ইনক্রিমেন্ট ও উৎসবভাতা মূল বেতনের চার ভাগের এক ভাগ পেয়ে থাকেন। ১০০ টাকা বাড়িভাড়া দিয়ে ঘরে তো দূরের কথা গাছতলায়ও থাকা যায় না। চিকিৎসাভাতা ১৫০ টাকা দিয়ে চিকিৎসার কিছুই হয় না। গ্রাম থেকে শহরে ভালো ডাক্তারের কাছে একবার আসা-যাওয়া করলে যাতায়াত ভাড়াই লাগে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা, ডাক্তারের ভিজিট কমপক্ষে ৩০০ টাকা। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কমপক্ষে লাগে ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা। তার পর ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ কেনার প্রয়োজন পড়ে।

১৫ নম্বর গ্রেডে ৫১০০ টাকা স্কেলে একজন শিক্ষক ইনক্রিমেন্ট পান মাত্র ৭০ টাকা এবং আজীবন এই একটি ইনক্রিমেন্ট পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ঐ স্কেলে একজন শিক্ষক চার ভাগের এক ভাগ হিসেবে বোনাস পান ১,২৭৫ টাকা। এ টাকা দিয়ে ঈদ উৎসবের খরচ বলতে কিছুই হয় না।

৫১০০ টাকা স্কেলে অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা কর্তনের পর একজন শিক্ষক প্রতিমাসে বেতন পান ৫১২৬ টাকা। এ টাকা দিয়ে সংসারের ভরণ-পোষণ মোটেই হয় না। কোনোরকমে ১০ দিন চলে। বাকি ২০ দিনের কোনো উপায় থাকে না। সংসারের যাবতীয় ব্যয় যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, বিদু্যৎ বিল, গ্যাস বিল, অতিথি আপ্যায়ন ও অন্যান্য আরও প্রয়োজনীয় ব্যয় এ টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। তখন বাঁচার তাগিদে তাদেরকে স্কুল টাইমের আগে-পরে অন্য একটা কিছু করতে হয়। যেমন হোমিও প্র্যাকটিস করা, কারো দোকানের বা ব্যবসার খাতাপত্র লেখা, কল-কারখানায় খণ্ডকালীন কাজ করা, প্রাইভেট পড়ানো ইত্যাদি। এহেন অবস্থার মধ্য দিয়ে খুব কায়ক্লেশের ভেতর দিয়ে তাঁদেরকে দিন কাটাতে হয়। পরিবারের কোনো চাহিদাই তাঁরা পুরোপুরি পূরণ করতে সক্ষম হন না। মেধা এবং ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন লেখাপড়ার মান উন্নয়ন করার সময় ও মন-মানসিকতা তাঁদের থাকে না। সোজা কথা হলো এই যে, শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ৫১০০ টাকার বেতনস্কেলটি কমপক্ষে ১৩,০০০ টাকায় উন্নীত করে প্রয়োজনীয় ভাতাসমূহ উলেস্নখযোগ্য হারে বাড়িয়ে যোগ করলে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। আর এটা অবিলম্বে করা উচিত, মেধাবীরা যাতে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হন এবং এ পেশায় থাকেন।

রায়পুরা, নরসিংদী