আমাদের বিদ্যালয় শিক্ষা প্রসঙ্গে কিছু কথা

orientation
কাজী নুসরাত সুলতানা


জগতের সমস্যাশঙ্কুল পরিবেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে টিকে থাকার প্রয়োজনে, নবতর পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের দাবীতে, মানুষকে নানা কিছু শিখতে হয়। মানুষ নিরন্তর শিখে চলেছে আবহমান কাল ধরে। মানুষের ভেতর রয়েছে শেখার এক সহজাত প্রবণতা; প্রয়োজন দেখা দিলে সে আপনা আপনিই শিখে নেয়, কেউ না শেখালেও। তবুও মানুষ, কালক্রমে, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে; অবশ্যই প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে। এ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে জ্ঞানের সীমা বর্ধিত হওয়ার কারণে, জ্ঞানভান্ডারে সঞ্চিত সম্পদ বিপুল থেকে বিপুলতর হতে থাকার কারণে, ব্যক্তির জ্ঞান আয়ত্তিকরণের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে। এ জন্যই মানুষ জ্ঞানসম্পদের বিভাজন উপবিভাজন ঘটিয়ে,ব্যক্তির ক্ষমতা অনুযায়ী বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু বিশেষায়িত জ্ঞান গ্রহন, সৃষ্টি ও প্রদানের যোগ্যতা অর্জনের আগে প্রয়োজন একটা পর্যায় পর্যন্ত কিছু সাধারণ দক্ষতা অর্জনের। এ দক্ষতা হবে পরবর্তী বিশেষায়িত জ্ঞানরূপ অট্টালিকার ভিত্তিস্বরূপ। অধিকাংশ শিক্ষাদার্শনিকের মতে শিক্ষার এই ভিত্তি রচনার সময়কাল হওয়া উচিত বারো বছর, অর্থাৎ শিক্ষার্থীর আঠারো বছর বয়োকাল পর্যন্ত। প্রযুক্তিগত পরিভাষায় অর্থাৎ শিক্ষাবিজ্ঞানের সাহিত্যে একে বলা হয় বিদ্যালয় শিক্ষা বা মৌলিক শিক্ষা। স্বনামধন্য শিক্ষাদার্শনিকগন এই সময়কালের শিক্ষাকে মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বলেছেন। কারণটি সহজেই অনুমেয়। ভিত্তি দৃঢ় না হলে তার উপর প্রস্তুতকৃত অট্টালিকা যেমন কখনও দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পারে না তেমনি শিক্ষার ভিত্তি দৃঢ় না হলে তার উপর গড়া উচ্চ শিক্ষার অট্টালিকা কখনও কাঙ্খিত সেবা দিতে পারবে না। তাই বলা হয় একটি রাষ্ট্রের সুশৃঙ্খল অগ্রযাত্রার জন্য অন্তত মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিক একান্ত আবশ্যক। আধুনিক উন্নত রাষ্ট্রসমূহ সেই বিবেচনা থেকেই বারো বছরের বিদ্যালয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতানক করার প্রয়াস পেয়েছে।
কিন্তু শিক্ষাকে কেবল বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করাই কাঙ্খিত শিক্ষিত নাগরিক পাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পদক্ষেপ নয়। শিক্ষার কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নীতিমালারও অর্থাৎ শিক্ষাদর্শন নির্ধারণও প্রয়োজন। আধুনিক উন্নত বিশ্বে এ নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণা হয়ে থাকে। কেবল আধুনিক বিশ্বই নয়, প্রাচীন বিশ্বও যে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিল তার প্রমান আমরা পাই সে সব কালে রচিত এ যাবৎ প্রাপ্ত সৃজনশীল ও দার্শনিক সাহিত্যের মাধ্যমে। এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকগনের রচনা।  এরিস্টটল তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে বলেছেন, “ শিক্ষা কি এবং নবীন ব্যক্তিবর্গকে কি ভাবে শিক্ষিত করে তোলা উচিত, এ সব প্রশ্ন বিবেচনার দাবী রাখে। বর্তমানে মতপার্থক্য রয়েছে শিক্ষার বিষয়বস্তু সম্বন্ধে, নবীনদের লক্ষ্য কি হওয়া উচিত মঙ্গলময়তা নাকি জীবন থেকে সর্বো”্যভাবে লাভবান হওয়া। কোনটাই পরিষ্কার নয় যে শিক্ষা কি অধিকতর সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিমত্তার চর্”ায় নাকি চরিত্রের। বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম এ সমস্যার সমাধান সরবরাহ করছে না।” সুতরাং বোঝা যাচ্ছে কোন কালেই নবীনদের উপযোগী শিক্ষাদর্শন প্রনয়ণের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলা হয়ে যায় নি। আর সেটি সম্ভবও নয়। কারণ স্থানকালপাত্রের প্রযোজন অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে সংরক্ষণ-সংযোজন-বিযোজন করাই যৌক্তিক পদক্ষেপ। এজন্যই প্রযোজন নিরন্তর পর্যালোচনার, গবেষণার।

আমাদের মুক্তির সংগ্রামে অবদান রাখার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। আগের কথা বাদ দিলেও, উনিশশো একাত্তরের ২৫শে মার্চের প্রথম প্রহরে পাক হানাদার বাহিনী যেসব নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙ্গালীর ওপর আধুনিক মারণান্ত্র নিয়ে আক্রমন করেছিল তাঁদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন শিক্ষক ও তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছাত্র। যুদ্ধের শেষের দিনগুলোতে তাদের মরণ কামড়ের শিকার হয়েছিলেন যাঁরা তাঁদেরও বিরাট এক অংশ ছিলেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কেবল তাই নয়, যাঁরা সরাসরি অংশগ্রহন করেছেন, জয়ী হয়েছেন অথবা আত্মোৎসর্গ করেছেন, যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, রসদ ও আশ্রয় যুগিয়েছেন, প্রয়োজনে ঢাল হয়েছেন, তাঁদেরও বিরাট অংশ শিক্ষক। তার কারণও সকলের জানা। আমাদের দেশে সে সময় প্রায় সত্তর শতাংশ জনগনই ছিলেন নিরক্ষর অথবা নিতান্তই স্বল্প শিক্ষিত। সে সময়, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠির কাছে, শিক্ষকরাই ছিলেন প্রধান পরামর্শদাতা। তাই আঘাতটাও তাঁদের ওপর বড় রকরমই এসেছিল।
তবে যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ তার সবটুকু এখনও অর্জিত হয়নি। তাই শেষ হয়নি শিক্ষকের কাজ। অবশ্য শিক্ষকের কাজ কোনদিনও শেষ হয়না। তবু বিজয়ের মাসে স্বাধীনতার স্বপ্নের অবাস্তবায়িত অংশগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করি সেগুলোও বাস্তবায়িত হবে। আর তাই আমরা, বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একটি স্বাধীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যোগ্য নাগরিক তৈরীর সংগ্রাম চালিয়েই যাব।

মানুষ স্বভাবগত ভাবেই স্বাধীনতা প্রিয়। এর কিছুটা প্রমান পেতে হলে বেশীদূর যেতে হবে না। যে কোন একটি পাঁচছ’বছরের শিশুর একটা দিনের আচরণ নিবীড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও এর প্রমান পাওয়া যাবে। শিক্ষাক্ষেত্রেও দরকার স্বাধীনতা। সেজন্যই বিভিন্ন শিক্ষাদার্শনিক স্বাধীনতার স্বপক্ষে এত সোচ্চার হয়েছেন। শিক্ষাক্ষেত্রের স্বাধীনতা বলতে কেবল শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা বোঝায় না। শিক্ষার ক্ষেত্রটিকে সুশিক্ষা-বান্ধব করতে হলে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পরিচালনা পর্ষদ – এঁদেরও স্বাধীনতা প্রয়োজন। কার ক্ষেত্রে এর মাত্রা কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে হবে শিক্ষাদর্শনের তত্ত্বের আলোকে। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে একটি প্রতিশ্র“তি হচ্ছে স্থানীয় গনতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। শিক্ষাক্ষেত্রেও এই নীতিটি প্রয়োগ করলে ভাল হয় উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ অনুসরণ করে। আর তাহলেই এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দিন বদলের সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে এদিকে সুচিন্তিত দৃষ্টিপাত একান্ত প্রয়োজন।


আমাদের স্বকীয়তার চেতনায় শানিত হওয়ার, নবজন্মে প্রাণিত হওয়ার মাস ফেব্র“য়ারি। কিন্তু ফেব্র“য়ারি এলে ভাষা শহীদদের স্মৃতি তর্পণের আনুষ্ঠানিকতা যে মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়, একুশের চেতনা হৃদয়ে ধারণ ও বছরজুড়ে তার লালন সে মাত্রায় হয় বলে মনে হয় না। তা না হলে এখনও কেন শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এত উচ্চারণগত ত্র“টি, এত বানান ভুল, বাক্যগঠনে এত অদক্ষতা! বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ও শিক্ষকদের এ ব্যাপারে আরও সচেতন হওয়া ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। আমরা মনে করি, বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণী উত্তরণের একটি আবশ্যকীয় শর্ত হওয়া উচিত সেই শ্রেণীর জন্য নির্ধারিত শব্দগুলোর সঠিক উচ্চারণ ও বানান জানা, সঠিক বাক্য গঠন তো বটেই Ñ তা সে ভাষা-বিষয়েরই হোক অথবা গনিত বা তথ্য-বিষয়েরই হোক। শিক্ষা-বিজ্ঞানের মতে ভাষা শেখানো কেবল ভাষা-শিক্ষকের দায়িত্ব নয়; এ দায়িত্ব যে কোন বিষয়-শিক্ষকেরও। কারণ শিক্ষাদার্শনিকেরা বলেন প্রতিটি শিক্ষকই ভাষার শিক্ষক। তাই এ ব্যাপারে শিক্ষকদের সচেতন হতে হবে এবং সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হবে।

একটি প্রবনতা ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে বেশ উল্লেখযোগ্য ভাবেই। তা হল, বাংলা বাক্যে প্রচূর ইংরিজি শব্দের ব্যবহার, একান্ত প্রয়োজনীয় না হলেও। যেন শিক্ষিত ব্যক্তির পরিচয় পরিস্ফুট হয় না একটি বাক্যের প্রায় অর্ধেক শব্দ ইংরিজিতে না বললে! অথচ শিক্ষাবিজ্ঞানের নির্দেশনা Ñ বরং দাবী হল, শিক্ষিত ব্যক্তি প্রথমত: নিজের মাতৃভাষা বা প্রথমভাষায় প্রাঞ্জল ও যৌক্তিকভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারবে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে অন্তত: একটি আন্তর্জাতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় দক্ষতা অর্জন করবে। আমরা মনে করি আমাদের ক্ষেত্রে শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলাভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করবে এবং সেই সাথে ইংরিজি ভাষাটি ভাল ভাবে শিখবে। ‘উদয়ের পথে’ উপন্যাসের নায়কের মত দৃঢ় কন্ঠে বলতে পারবে,“ আমি দুটো ভাষাই জানি কিনা, তাই মেশাবার দরকার হয় না।” আমরা আশা করি শিক্ষক এবং অভিভাবকগন আমাদের নবীন শিক্ষার্থীদেরকে ঐ রকম আদর্শে দীক্ষিত করবেন।

এ বছরের ভাষার মাসে, স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেরণা জোগানোর মাসে, মনে হয় আমাদের আরও একটি অঙ্গীকার করা উচিত। আমরা অঙ্গীকার করতে পারি আগামী ফাল্গুন আসার আগেই আমাদের দেশের অন্তত: ষাটভাগ মানুষকে পত্রপত্রিকা পড়ার যোগ্য করে তোলার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহন করব। সরকার, শিক্ষক, সমাজ যে যার অবস্থান থেকে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রে সচেতন ও আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালালে ঐ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এভাবে ধাপে ধাপে অগ্রসর হলে অচিরেই আমরা শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। শিক্ষাক্ষেত্রের কর্মী হিসেবে শতভাগ সাক্ষর বাংলাদেশ দেখা আমাদের ঐকান্তিক কামনা।


ইংরেজি মার্চ মাসে আছে সেই দুটো তারিখ Ñ যার প্রথমটি জঘন্যতম কালরাত্রির প্রতীক, আর পরেরটি উজ্জ্বলতম রাঙাদিনের প্রতীকÑ স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশীদের জন্য, বাঙালীর জন্য একটি শোকের আরেকটি আনন্দের; কোনটিই খাটো করার নয়। শোকের দিনে পাই সংহত হওয়ার শক্তি আর আনন্দের দিনে পাই এগিয়ে যাবার প্রেরণা।
এ দু’টি দিনের কোনটিকেই বয়ে যেতে দেন না কোন সার্থক শিক্ষক। তিনি ধাপে ধাপে, শিক্ষার্থীর মননবিকাশের স্তর অনুযায়ী তাদের কাছে তুলে ধরেন এসব দিবসের তাৎপর্য। কারণ আমরা জানি আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে যোগ্য নাগরিক তৈরীতে সহায়তা করা। আর যোগ্য নাগরিকের প্রথম বৈশিষ্ট্য হল দেশপ্রেমী হওয়া। শিক্ষার্থীদেরকে একটু একটু করে দেশ ও জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শৌর্য-বীর্য, দু:ক্ষ-যন্ত্রনা, আনন্দ-আকাক্সক্ষা এসব বিষয়ে সচেতন করার দায়িত্ব যে বিদ্যালয়ের তথা শিক্ষকের এ কথাও আমরা জানি। শিক্ষকসমাজও তার দায়িত্ব পালনে তৎপর। তবু অনেক ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থেকে যায়; নানা কারণে। আমাদের কর্তব্য হবে সেসব কারণ দূর করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করা। এ বছরের স্বাধীনতা দিবসে এ হোক আমাদের অঙ্গীকার।
স্বাধীনতার আটত্রিশ বছর পরও আমরা কিন্তু বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুদের সবাইকে বিদ্যালয়ে আনতে পারিনি। যারা এসেছে তাদের অর্ধেককেও পার করাতে পারিনি প্রাথমিক স্তর। একটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশ হিসেবে এ আমাদের নিদারুণ ব্যর্থতা। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। এ বছরের স্বাধীনতা দিবসে আমাদের সরকারেরও একটা অঙ্গীকার করা উচিত। অঙ্গীকার করা উচিত, আত্মমর্যাদাশীল দেশগুলোর মত, আমাদের সন্তানদেরও বারো বছর সময়কালের বিদ্যালয়শিক্ষা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর। সেই সাথে আরো অধিক সংখ্যায় কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপনেরও প্রচেষ্টা গ্রহন করা প্রয়োজন। এ কাজে স্বল্প মেয়াদী সময়সীমা নির্ধারণ করে লক্ষ্য স্থির করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অর্থ নিয়োজন কোন ব্যয় নয, বরং বিনিয়োগ, যদিও দীর্ঘ মেয়াদী। এ প্রচেষ্টায় যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা সফল হব ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের নাগরিকদের সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে অগ্রসরমান জাতি হিসেবে পরিগনিত হব না।


প্রাথমিক স্তর শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিস্বরূপ। শিক্ষার্থীর এই স্তরে অর্জিত মানের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ধাপগুলোর সফলতা। শিক্ষার্থীর জন্য অর্জনযোগ্য দক্ষতার যাচিত মান অর্জনে সহায়তার ক্ষেত্রে মূল চালিকা শক্তি হলেন শিক্ষক। শিক্ষক কতখানি সার্থক সহায়তা দিতে পারবেন তার অনেকখানি নির্ভর করবে তাঁর কর্মসন্তুষ্টির ওপর। আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা দেখা যাচ্ছে। নানা কারণে শিক্ষকদের কর্মসন্তুষ্টি আসার পথে বিেেঘœর সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নিম্ন পদমর্যাদা, নিম্ন বেতনক্রম ও পদন্নোতির সুযোগের অভাব। এ ব্যাপারে শিক্ষকগন অনেকদিন ধরেই আওয়াজ তুলছেন। আওয়াজ তোলাটা অযৌক্তিকও নয়। বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির যোগদান ঘটছে। এর প্রয়োজনও রয়েছে, একে উৎসাহিত করাও দরকার। এর কারণ হিসেবে অনেক বক্তব্য উপস্থাপন করা যায়। আপাতত এটুকু বলতে চাই যে, প্রাথমিক স্তর হচ্ছে নবীন শিক্ষার্থীকে শিখতে শেখার প্রচেষ্টায় সহায়তা করার সময়। আপাত দৃষ্টিতে কাজটি সহজ মনে হলেও, শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষা দার্শনিক জানেন, প্রকৃত পক্ষে তা অত্যন্ত কঠিন। এ প্রচেষ্টায় ঘাটতি থেকে গেলে শিক্ষার্থীর উচ্চতর জ্ঞানের বা শিক্ষার অট্টালিকা সগৌরবে দাঁড়াতে পারবে না। আশা করা যায় উচ্চতর শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ এ ক্ষেত্রে অধিকতর সফল হবেন। আমরা লক্ষ্য করছি ইদানিং ন্যুনতম যোগ্যতার চেয়ে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে মহিলারা, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আসছেন। তাই স্তর নয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন ও মর্যাদার ক্রম নির্ধারণ করা দরকার।
আমরা আশাকরি বর্তমান গনতান্ত্রিক সরকার এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এর আশু সমাধানের চেষ্টা করবেন। সরকারকে যত শিঘ্র সম্ভব শতভাগ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এটি একটি পূর্বশর্ত হতে পারে; প্রণোদনাও হতে পারে।


প্রকৃতির স্নিগ্ধ দান উপভোগে ছোট ছেলেমেয়েদের যে আনন্দ তা অনুভব করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:
মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি।
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি।
কী করি আজ ভেবে না পাই,    পথ হারিয়ে কোন বনে যাই,
কোন মাঠে যে ছুটে বেড়াই সকল ছেলে জুটি।
আরেক গানে লিখেছেন:
ওরে, যাব না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে।
ওরে, আকাশ ভেঙ্গে বাহিরকে আজ নেব রে লুট করে।
আমরা আমাদের শিশুকিশোরদেরকে ওই রকম নির্মল আনন্দলাভের সুযোগ কতটা দিতে পারছি? গ্রামের ছেলেমেয়েরা কিছুটা তবু পায়। কিন্তু রাজধানী ঢাকার বেশীর ভাগ শিশুই যে মুক্ত অঙ্গনে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছে না তা বলাই বাহুল্য। বাসস্থানের তো কথাই নেই, হাতেগোনা কয়েকটি বিদ্যালয় ছাড়া বেশীরভাগ বিদ্যালয়েই খেলার জায়গা নেই। মফস্বল শহরেও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য উপযুক্ত পরিমান জমি বরাদ্দ থাকে না। ঢাকার রমনা এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখলাম  বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নেমে দশ হাত চওড়া ও বারো হাত মত লম্বা এক ফালি চত্তর, তার পরেই ফটক। দৈনন্দিন সমাবেশেরই জায়গা নেই, খেলা তো দূরের কথা! অথচ বাজার অথবা দোকানপাটের জন্য জায়গার অভাব হয় না আজকাল। শিশুদের মঙ্গলামঙ্গলের প্রতি এতটা উদাসীন ও অসচেতন জাতি আর আছে কিনা জানা নেই! শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে অঙ্গনসমৃদ্ধ বাড়ির ব্যবস্থা করা তো আর সম্ভব নয়, অন্তত: বিদ্যলয়গুলোতে একটা করে মাঠের ব্যবস্থা করা হোক, এই দাবী রাখছি।

উন্নত দেশগুলোতে বারো বছরের বিদ্যালয়শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক। অথচ আমরা এখন পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষাও বাধ্যতামূলক করতে পারিনি। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা উন্নত দেশগুলোর সমকক্ষতা আদৌ অর্জন করতে পারব কিনা জানি না। কিন্তু একটি সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা আমাদের নাগরিকদের জন্য মৌলিক শিক্ষাটুকু নিশ্চিত করতে পারলাম না!  এরকম একটা ব্যর্থতা নিতান্তই লজ্জাজনক। বরং বলা যায় ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
শিক্ষা তো বিলাস নয়, ব্যক্তির জন্য তো বটেই, রাষ্ট্রের জন্যও শিক্ষা অপরিহার্য বিষয়। দেশের অধিবাসী, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে উন্নত রাষ্ট্রের উপযোগী সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার বিকল্প নেই। তাই এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টার ঘাটতি থাকা মোটেও উচিৎ নয়। অথচ তাই হয়েছে আমাদের দেশে। বর্তমান সরকার এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করবেন বলে আশা করি।
এ ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হলে সরকারের যে বিষয়গুলো আশু করণীয় তার একটি হল, বরং প্রথমটি হল মানসম্মত পর্যাপ্ত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতার পর বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুকিশোরের সংখ্যা বেড়েছে বহু গুণ, কিন্তু সেই অনুপাতে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়েনি। প্রাথমিক বিদ্যালয় কিছু স্থাপিত হলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ফলে এমন অনেক বেসরকারি বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে যেগুলোর মানসম্মত ভৌত সুবিধা ও শিক্ষণগত আয়োজনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আদর্শ সুবিধাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দায়িত্ব সরকারেরই।
বর্তমান সরকার বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আমরা মনে করি এটি একটি ভাল সিদ্ধান্ত। তবে শুধু গ্রন্থাগার গড়ে তুললেই প্রকৃত উপকার পাওয়া যাবে না। শ্রেণী-সময়তালিকায় সময় বরাদ্দ করে শিক্ষার্থীদের তা ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আশাকরি সরকার এ ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

শিক্ষা প্রক্রিয়াটি দুটি মূল উপাদানের ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার দ্বারা চলমান থাকে। এই উপাদান দুটির একটি হল যে শেখে, আর অপরটি হল যে শেখায়। যে শেখে তাকে আমরা শিক্ষার্থী বলি। এটি একটি একক সত্ত্বা। কিন্তুু অপর উপাদান, যাকে বলছি ‘যে শেখায়’, সেটি অনেক ধরণের সত্ত্বার ও বিষয়ের সমবায়ে গঠিত। তার মধ্যে প্রধান কটি হল: পরিবার, শিক্ষক, বিদ্যালয়, পাঠ্যক্রম, প্রশাসন, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক ও সাস্কৃতিক পরিবেশ, সামাজিক ও সাস্কৃতিক সংস্থাসমূহ ও গণমাধ্যমসমূহ। এগুলোকে শিক্ষার মাধ্যমও বলা যায়। শিক্ষাবিজ্ঞানের নানা তত্ত্বউপাত্তের মাধ্যমে জানা যায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষার মাধ্যমসমূহের মধ্যে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া নিবীড় ও সাবলীল হলেই শিক্ষা প্রক্রিয়াটির চলা সার্থক হয়। অন্যথায় অনেক ফাঁক থেকে যায়। শিক্ষা প্রক্রিয়ার সার্থকতা যেমন শিক্ষার্থীর জন্য তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়। কি কি উপায়ে শিক্ষা প্রক্রিয়ার সার্থক চলা নিশ্চিত করা যায় তা আমাদের সবাইকে ভাবতে হবে এবং করণীয় করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত উপযুক্ত বিশেষজ্ঞদের দ্বারা করণীয় চিহ্নিত করে সকল পক্ষকে অবহিত করা।
এ বিষয়টির অবতারণার কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে। ইদানিং দেখা যাচ্ছে শিক্ষা প্রক্রিয়াটি বড় বেশী যান্ত্রিক হয়ে উঠছে – কেবল পঠনপাঠন ও পরীক্ষা নির্ভর- তা সে বিদ্যালয়েই হোক অথবা গৃহেই হোক। শিক্ষাশাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনেরা একে ‘অবৈজ্ঞানিক’ বলবেন। কেবল পঠনপাঠন ও পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাওয়ানোর মাধ্যমে কখনওই একটি শিশুকে ‘মানুষ’ করে তোলা যাবে না। আনুষঙ্গিক আরো কিছু কর্মকান্ড প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদেরকে সাস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে বটে, কিন্তু তারও লক্ষ্য পরীক্ষা- তাও বিরাট বড় পরিসরে। এতে করে শিশুকিশোর মনের উপর যে চাপের সৃষ্টি হচ্ছে তা কিন্তু মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। যে কোন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীই এ কথা বলবেন। শিশুকিশোর শিক্ষার্থীর সামনে প্রতিদ্বন্দ বা চ্যালেঞ্জ অবশ্যই থাকা দরকার। তা না হলে সে শেখার ব্যাপারে কোন প্রেষণা অনুভব করবে না। আর প্রেষণা না জাগলে শিখন সম্ভব হয়না। একথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু শেখার কালে প্রতিদ্বন্দটা থাকার কথা তার নিজের সঙ্গে, অন্যের সঙ্গে নয়। এর কারণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা আমাদেরকে আরো বিস্তারিত জানাবেন বলে আশা রাখি।


ইংরিজিতে একটি প্রবচন আছে, ‘You can take a horse to the water but you cannot make him drink.’ শিক্ষার বেলায় এ কথাটি সর্বাংশে সত্য। তাই বলা হয় ‘কাউকে কিছু শেখানো যায় না যদি না সে নিজে শিখতে চায়’। অথচ শেখাতে হবে। বিশেষ করে নবীন প্রজন্মকে অনেক কিছু শেখাতে হবে। মানব জাতির হাতে এখন বিশাল ও সম্বৃদ্ধ এক জ্ঞানের ভান্ডার। শিশুকে তার বিশ বা পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যে সেই জ্ঞানভান্ডারের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা দরকার। তা না হলে শিশুর অগ্রগমন বাধাগ্রস্ত হবে, সংকটাপন্ন হবে জগত ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ। সেই জন্যই বিদ্যালয়, পাঠ্যক্রম ও নিয়মতান্ত্রিকতার এত গুরুত্ব। এরই ফলে উদ্ভাবিত হয়েছে পাঠদানের নানা রকম পদ্ধতি, নানা নিয়মকানুন। এসব পদ্ধতি ও নিয়মকানুনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মধ্যে আগ্রহ ও প্রেষণা জাগানো যায় এবং আকর্ষণীয় ও বৈচিত্রপূর্ণভাবে বিষয়বস্তু তার সামনে উপস্থাপন করা যায়।
আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ঐসব পদ্ধতির জ্ঞানলাভ করেন,অনুশীলন করেন যখন তাঁরা তাঁদের পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু দেখা যায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা সেগুলো শ্রেণীকক্ষে ব্যবহার করতে পারেন না। এর নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে সেগুলো উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। কেননা সফল শিখনের জন্য সফল শিক্ষণ দরকার। সফল শিক্ষণ নিশ্চিত হতে পারে উপযুক্ত পাঠদান পদ্ধতির মাধ্যমে। তাই জানা থাকা সত্তেও কেন শিক্ষকরা সেগুলো ব্যবহার করছেন না তা জানা দরকার। সাধারণ ভাবে শিক্ষকরা যে কারণগুলোর কথা বলে থাকেন সেগুলো হল: শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত ঐসব পদ্ধতির ব্যবহারের অনুকূল নয়, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বস্তুগত ও মনস্তাত্মিক যে সব সহযোগিতা পাওয়ার কথা তা তাঁরা পান না, অভিভাবকেরা ফলাফলের ক্ষেত্রে কেবল নম্বর বোঝেন – শিক্ষার্থীর সুষম উন্নয়নের বিষয়টি বোঝেন না। অভিযোগগুলো গুরুতর এবং প্রণিধানযোগ্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ যথা শিঘ্র সম্ভব গ্রহণ করবেন এই কামনা করছি। কারণ ঐ পদক্ষেপ শুধু যে ব্যক্তিশিশুকে উপযুক্ত মানুষ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে তাই নয়, রাষ্ট্রের উপযুক্ত নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সেটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১১
সরকার প্রণীত শিক্ষানীতি ২০০৯ লোকসমাজে যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছে। বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক এবং অভিভাবক সবাই এ ব্যাপারে বিশেষ সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা প্রদর্শন করছেন। প্রণীত শিক্ষানীতির ভিত্তিতে যে সব মতামত প্রকশিত হচ্ছে পত্রপত্রিকায় ও সভাসেমিনারে, সেগুলোর কিছু পক্ষে থাকছে কিছু বিপক্ষে থাকছে; কিছু থাকছে প্রসংশাসূচক, কিছু থাকছে সমালোচনামূলক, কিছু থাকছে সুপারিশমূলক। একটি গনতান্ত্রিক দেশের জন্য এটি একটি ইতিবাচক অবস্থান। অবশ্যই এটি সম্ভব হয়েছে শিক্ষানীতির দলিলটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে পড়তে পারার ফলে। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার দিকে এটিকে একটি প্রাথমিক সফল পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করা যায়।
আমরা মনে করি সমালোচনামূলক ও সুপারিশমূলক লেখা ও বক্তব্যগুলো সরকারের বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত; বিশেষ করে যেসব প্রবন্ধ ‘পেডাগজি’ বা শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞানের আলোকে রচিত।
যেকোন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক(উচ্চমাধ্যমিকসহ) স্তর। এই বারো বছরের সময়কালে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষাগ্রহনের কর্মকান্ডে যত সার্থক সহায়তা দেওয়া যাবে তত তাদের যোগ্য নাগরিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জল হবে। এজন্য অতি প্রাচীনকাল থেকেই নানা দেশে এ বিষয়ে নানা গবেষণা ও পরীক্ষানিরীক্ষা হয়ে আসছে। সেসব গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে শিক্ষাবিজ্ঞানের এক সম্বৃদ্ধ শাত্র। তাই মৌলিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনের সময় শিক্ষাবিজ্ঞানের, বিশেষ করে শিক্ষাদর্শনের জ্ঞানে ও চর্চায় দক্ষ ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ নিলে ভাল হয়।
শিক্ষা প্রক্রিয়টি একটি জটিল ও সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াটির চলমানতা সম্ভব করা ও রক্ষা করা শিক্ষার্থীর নিজস্ব ব্যাপার। বাইরে থেকে কেউ প্রক্রিয়াটি চালাতে পারে না, চলতে সাহায্য করতে পারে মাত্র। সাহায্য করার ব্যাপারটিও সহজ নয়। এটি একটি বিশেষায়িত কৌশলী বা ঃবপযহরপধষ কাজ: বিশেষ করে মৌলিক শিক্ষা স্তরের ক্ষেত্রে। সে কারণেই এই ক্ষেত্রটির জন্য নীতি নির্ধারণ করার সময় বিশেষায়িত বিচারের সাহায্য নেওয়া দরকার, কেবল জনপ্রিয় নয়। তাহলেই সেই নীতির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া যাবে।

১২
সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম বিদ্যালয় শিক্ষাস্তরের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এসব কার্যক্রমের পরিচালনার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে যেমন একটা আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় তেমনি উন্মোচিত হয় শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সম্ভাবনার নানা দিক। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যালয় কেবল লেখায় ও পড়ায় যোগ্যতা অর্জনের এবং সেসব সংক্রান্ত মেধা যাচাইয়ের ক্ষেত্র নয়; শিক্ষার্থীর নানামুখী সম্ভাবনা লালনের ক্ষেত্র। সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলী পরিচালনার মাধ্যমে বিদ্যালয় ঐ দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালনের চেষ্টা করে থাকে।
প্রকৃতির প্রয়োজনেই এক এক শিশুর মধ্যে এক এক ধরণের দক্ষতা ও যোগ্যতার সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন যোগ্যতার সমষ্টিই মানব জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সাফল্যের অভিজ্ঞতা ব্যক্তির কর্মপথে একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে; তাকে আরো এগিয়ে যাবার প্রেরণা যোগায়। কোন শিশুর লেখা-পড়া-পরীক্ষা নামক ক্ষেত্রটি থেকে এই অভিজ্ঞতা লাভ করার যোগ্যতা না থাকতে পারে, খেলা, গান বা ছবি আঁকায় থাকতে পারে। সে ঐ সবের কোন একটি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে সবাইকে চমৎকৃত করে দিতে পারে। এই সুযোগ দেওয়া উচিৎ; সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীর অনুশীলন এই সুযোগ দেওয়ার প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা। শিক্ষক, অভিভাবক সবারই এ ব্যাপারে তৎপর থাকা উচিৎ।

১৩
আমাদের বর্ষ শুরুর মাস বৈশাখ। দারুণ উৎসাহে, বহু আড়ম্বরে পালিত হয় বৈশাখের প্রথম দিন ‘পয়লা বৈশাখ’। এ দিনের বর্ণিল উৎসব আজ বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব, সার্বজনীন আনন্দ-আয়োজন, ‘ষোলআনা বাঙ্গালীয়ানা’ চর্চার দারুণ সৌন্দর্য আর সৌকর্যময় এক মহা সম্মিলন।
কিন্তু ‘ষোলআনা বাঙ্গালীয়ানা’ বলতে কি বোঝায়? তার আগে, ‘বাঙ্গালীয়ানা’ বলতেই বা কি বোঝায়? এ বিষয় সম্পর্কে আমাদের, বিশেষ করে শিক্ষক ও অভিভাবকদের স্বচ্ছ ও বিস্তৃত ধারণা থাকা দরকার। কারণ সংস্কৃতিচর্চার প্রথম পাঠ নবীন নাগরিক অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছেই পায়।
আমরা মনে করি সংস্কৃতির উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে ভাষা। আমরা যে বাঙ্গালী, ফরাসি বা চৈনিক নই তার একটা লক্ষণ আমরা বাঙলা ভাষায় কথা বলি, বাঙলাভাষা আমাদের প্রথম ভাষা। তাই বাঙলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা এবং বাঙলা ভাষার সযতœ চর্চা অব্যাহত রাখা আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত।
শুধু ভাষা নয়, আমাদের চালচলন, আচার-ব্যবহার আর প্রথা-প্রণালীতেও ফুটে ওঠার কথা বাঙ্গালী ঐতিহ্য। এ ব্যপারেও আমাদের সচেতন থাকা দরকার। ইদানিং একটি প্রক্ষিপ্ত প্রথাকে বেশ প্রচলিত করে তোলা হয়েছে। সেটা হল পান্তাইলিশ খাওয়া। খানিকটা প্রহসনের মত মনে হয় ব্যপারটা। এতে একদিকে আমাদের শ্রমজীবী মানুষদেরকে ঠাট্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে জাটকা না ধরার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে। তাছাড়া ইলিশ তো আমদের গ্রীষ্মের নয় বর্ষার মাছ!
উৎসবের দিনে ভাল পোষাক পরার, ভাল খাওয়া-দাওয়া করার আকাঙ্খা আমাদের থাকে। তাই শহুরে সমর্থ মানুষেরা নিজেদের জন্য সাজানো পান্তা আর চড়া দামের ইলিশের আয়োজন না করে যদি শ্রমজীবি মানুষদের মধ্যে গরম ভাতের সাথে ঘি আর দুধকলার ব্যবস্থা করার সামর্থ তৈরী করে দিতে পারেন তবেই সত্যিকার শাশ্বত বাঙ্গালী হতে পারবেন।
এসব বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরী করা শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে আমরা মনে করি।

১৪
আমরা প্রায়শ: বলে থাকি ‘শিক্ষককে বহতা নদীর মত হতে হবে, বদ্ধ জলাশয়ের মত নয়’। আমরা জ্ঞানচর্চার প্রসঙ্গে এ কথা বলি। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকের উচিৎ প্রতিদিনই কিছুটা পড়াশোনার চেষ্টা করা, নতুন কিছু জানার চেষ্টা করা এবং শিক্ষার্থীদেরকে তাদের স্তর অনুযায়ী সেসব জানানোর চেষ্টা করা। তাহলেই তিনি বহতা নদীর মত থাকবেন, বদ্ধ জলাশয় হয়ে পড়বেন না; জ্ঞানের স্রোত তাঁর মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হতে থাকবে অনবরত। পেশার প্রতি নিষ্ঠাবান, উপার্জনের প্রতি সৎ এবং আত্মমর্যাদাশীল সার্থক শিক্ষকের এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যটি অর্জন করার বা পড়াশোনার অভ্যাসটি লালন করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিশিক্ষকের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সমান দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, সমাজের এবং রাষ্ট্রের। এদের দায়িত্ব রয়েছে পড়াশোনার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, পাড়ামহল্লায় এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রচূর ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তোলা দরকার। এসব গ্রন্থাগারে যেমন থাকবে নানা ধরনের বইপত্র তেমনি থাকবে ইনটারনেট-এর সুবিধাসহ কমপিউটার। বিদ্যালয় সময়তালিকায় শিক্ষকদের জন্য সাধারণত একটা ঘন্টা ফাঁকা রাখার চেষ্টা করা হয়, একটু বিশ্রামের সুযোগ দেওয়ার জন্য। এই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করা, বরং সময়টি দ্বিগুন করা দরকার। এ জন্য প্রয়োজন হলে আরো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। অবশ্য পর্যাপ্ত বই থাকলে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার নিয়ম চালু করা যায়। এ ভাবে  শিক্ষকদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করলে কেবল যে ব্যক্তি উপকৃত হবেন তা নয়; প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং প্রাকারান্তরে দেশ উপকৃত হবে।
আমরা শিক্ষার্থীদের জন্যও দৈনিক সময়তালিকায় ঘন্টা বরাদ্দ রেখে পাঠপ্রকল্প চালু করার পক্ষপাতী। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে পূর্ববর্তী কোন একটি সংখ্যায়।
দেশ ও দশের উন্নয়নের জন্য জ্ঞানসমৃদ্ধ ব্যক্তি তথা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কোন বিকল্প নেই। আর এর জন্য প্রয়োজন লেখাপড়ায় অর্থাৎ জ্ঞানচর্চায় অভ্যন্ত জনগোষ্ঠি। তাই যত প্রকারে সম্ভব সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। নিজনিজ অবস্থান থেকে, যতটুকুই সম্ভব, এই সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।