একুশের চেতনা: বাংলা না বাংলিশ

1455637869_p-3

নুসরাত সুলতানা
কতকগুলো বিষয় আর শব্দের ব্যবহার আমি ঠিক মেনে নিতে পারছি না। যদিও জানি আমার মানা না মানায় কারুর কিচ্ছুটি এসেযায় না, তবুও নিজের মতামত প্রকাশ করতে কলম ধরলাম। কেউ মানুক না মানুক, বলতে তো বাধা নেই।
কি দিয়ে শুরু করি? বর্ণক্রমেই চলা যাক; সেটাই নিরাপদ!
একশে ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিকতা বেশ কয়েক বছর ধরে শুরু হচ্ছে রাত বারোটায়। গোড়ায় হতো সূর্যওঠা ভোরে, প্রভাত ফেরী দিয়ে। কেন এ পরিবর্তন? এটা তো বাঙ্গালীর ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়! বাঙ্গালীর তো দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার সাথে। আমরা তো আবহমান কাল ধরে পাখির ডাকে উঠে দিনের কাজ শুরু করেছি। তাহলে একুশে ফেব্রুয়ারির বেলায় এখন কেন সেই ঐতিহ্যকে বদ্লে ফেলা হল? এটা কি একুশের মূল চেতনার পরিপন্থী হয়ে গেল না! মাঝরাতে দিন শুরুর সংস্কৃতি তো তো পশ্চিমাদের। সেটা কেন নকল করতেই হবে আমাদেরকে? তাও আবার এমন একটা ব্যাপারে যা আমাদের বাঙ্গালী হিসেবে আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রতীক! বলতে পারেন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটা তো নিয়েছ; বল তো একুশে ফেব্রুয়ারি, ৯ই ফাল্গুন তো বল না।’ সেটা তবু মানতে পারি। কারণ দৈনন্দিন কাজের হিসেবটা ওই খ্রিস্টিয় বর্ষপঞ্জী অনুসারেই চলছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সঙ্গতি রাখার প্রয়োজনে। কিন্তু রাত বারোটাকে কিছুতেই মানতে পারছি না প্রভাত ফেরীর বদলে।
একুশে ফেব্রুয়ারির কথায় মনে পড়ল আমাদের দেশের ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের, না ভাষা নয়, বরং ঐ ভাষাটির শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে একটি বিশেষ প্রবণতার কথা। ইদানিং লক্ষ্য করছি তরুণ প্রজন্ম তো বটেই বেশ কিছু পরিণত ব্যক্তিও একটি বাংলা বাক্যে ইংরেজি শব্দ অধিক থেকে অধিকতর হারে ব্যবহার করছেন। তা সে শব্দগুলো যদি পারিভাষিক শব্দ হতো তা হলে মানতে আপত্তি ছিল না (সাময়িক ভাবে যদিও), কিন্তু সেগুলো সাধারণ শব্দ; যে সব শব্দের একাধিক এবং সুন্দর সুন্দর শব্দ রয়েছে আমার ভাষায়। তাই ঐ প্রবণতাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। উদাহরণ? তা হলে বলি শুনুন। খুব সাধারণ শব্দের কথাই বলি। যেমন, তাঁরা ‘তো’ বলতে পারেন না, বলেন ‘সো’; তাঁরা ‘তৈরী’ বাইরে বেরুতে পারেন না, ‘রেডি’ হয়ে বের হন; ‘এই যে শুনুন ভাই’ বলতে লজ্জা পান, বলেন, ‘এই যে হ্যালো ভাই’। মাতৃস্থানীয়া কাউকে সম্বোধন করতে হলে বলেন,‘ আন্টি’, পিতৃস্থানীয় কাউকে সম্বেধন করতে গিয়ে বলেন ‘আঙ্কেল’, যেন আমাদের বাংলা ভাষায় ওর সমকক্ষ কোন শব্দই নেই! খবরের কাগজ চলে না, তাঁরা পড়েন ‘পেপার’। বসার ঘর, শোবার ঘর, খাবার ঘর, রান্না ঘর তো অসম্ভব ব্যাপার! ভাবখানা, ওসব আমাদের কোনকালে ছিল না, ইংরেজরা এসে করে দিল। সুতরাং ওগুলোর জন্য ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতেই হবে, গত্যান্তর নেই! হ্যাঁ, টেবিল-চেয়ার আমাদের ছিল না; আমরা মাটির সঙ্গে সখ্য বজায় রেখে আসন পেতে অথবা মাদুর বা সতরঞ্জির ওপর চাদর বিছিয়ে খেতে বা পড়তে বসেছি; পিঁড়ি বা চৌকিও ব্যবহার করেছি। পরে টেবিল-চেয়ার যখন এল আমরা নিলাম কিছু সুবিধে বিবেচনা করে; সাথে সাথে ওগুলোর নামবাচক শব্দগুলোও নিলাম। নেব না কেন, নিয়েছি, নিচ্ছি, নেবও। তাই বলে নিজের যা আছে তা ফেলে দেব অবহেলায়, অশ্রদ্ধায়! আরো শুনুন, ‘প্রিয় দর্শকবৃন্দ’ বা ‘প্রিয় শ্রোতা’ বলতে আমাদের নতুন প্রজন্মের ঘোষকদের বোধহয় জাত যায়; তাই তাঁরা বলেন, ‘ডিয়ার ভিউয়ারস’ বা ‘ডিয়ার লিস্নারস’। আমাদের ছেলেমেয়েরা বন্ধুদের সম্ভাষণ করতে ‘হাই ফ্রেন্ডস’ না বলে পারেন না। নাহ্, মানতে পারি না। মাথাটা গরম হয়, হতে হতে মনটা হয়ে পড়ে দু:খভারাক্রান্ত।  শুধু কি তাই? এখন তো লক্ষ্য করছি কেবল শব্দ নয়, একটা বাক্যের প্রায় অর্ধেকই বলা হচ্ছে ইংরেজিতে, বাকীটুকু কোনমতে বাংলায়।
আরো একটা বিষয় কিছুতেই মানতে পারি না। সেটা হল, আমাদের মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের মাবাবাদের তাদের সন্তানদেরকে নিয়ে পঙ্গপালের মত ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। আর তারপর গর্ব করে বলা ‘ও বাংলাটা বলতেও তেমন একটা পারে না। তবে ইংরেজিটা ভাল পারে।’ ভাবুন একবার লড়াই করে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা আমাদের বর্তমান অবস্থাটা!
লক্ষ্য করেছেন বাড়ির নাম, দোকানের নাম, অপিস বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এসব কিছুর নাম রাখা হচ্ছে ইংরেজিতে ? শুধু শব্দ নয় বর্ণমালাও রোমক! বলতে পারেন, তোমার যে নাম রাখা হল বিদেশী ভাষায় – তাতে বুঝি দোষ হল না? দোষ না ধরলেও চলে বোধহয়। কারণ ও ব্যাপারে আবার ধর্মীয় মনোভাবের প্রভাব কাজ করে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোন মনোভাব কাজ করে? দাস্য?
হল কি বাঙ্গালীর! স্বাজাত্যাভিমানের সবটুকুই কি খুইয়ে ফেলব শেষে! অথচ আমাদের কালে আদর্শ ছিল উদয়ের পথে উপন্যাসের নায়কের মুখে উচ্চারিত বাক্যটি, ‘আমি দুটো ভাষাই জানি কিনা তাই মেশাবার দরকার হয় না’।
বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মেশানো বাক্যে কথা বলাটা শিক্ষিত হওয়ার সূচক! আধুনিকতার সূচক! লেখা পড়ায় উন্নত হওয়ার সূচক! চৌকস হওয়ার সূচক! মানতে পারছি না। আমার কাছে এটা হীনমন্যতারই প্রকাশ মনে হয়; ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি – শুধু নিজের নয় বিশ্বেরও Ñ জ্ঞানের অভাবের প্রকাশ বলে মনে হয়। গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার পরিণতি সম্বন্ধে অজ্ঞতার প্রভাব মনে হয়।
থাকগে যাগগে! কি হবে লেখালেখি করে! কারই বা দায় পড়েছে আমার মত ষাটোর্ধ শিক্ষাদর্শনের ছাত্রীর কথা মানতে! রবীন্দ্রনাথের কথাই কেউ মানল না, আমি তো কোন ছার! আমাদেরকেই সব মানতে হবে।

নুসরাত সুলতানা
অধ্যাপক, দর্শন
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, জাহেদা সফির মহিলা কলেজ, জামালপুর
সাবেক উপাধ্যক্ষ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা