মাধ্যমিক শিক্ষা

explore-it-bangladesh-300x160
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
নতুন শিক্ষা কাঠামোয় নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর হিসেবে বিবেচিত হবে। এই স্তরের
শিক্ষাশেষে শিক্ষার্থীরা সামর্থ্য অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ধারায় যাবে, নয়তো অর্জিত বৃত্তিমূলক শিক্ষার
ভিত্তিতে বা আরো বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে জীবিকার্জনের পথে যাবে। মাধ্যমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
নিম্নরূপ :
১.শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত মেধা ও সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশে সাহায্য করা।
২. কর্মজগতে অংশগ্রহণের জন্য, বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, একটি পর্যায়ের প্রয়োজনীয়
দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিরূপে শিক্ষার্থীকে তৈরি করা।
৩. মানসম্পন্ন শিক্ষাদান করে প্রাথমিক স্তরে প্রাপ্ত মৌলিক জ্ঞান সম্প্রসারিত ও সুসংহত করা। এর ফলে
শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানস¤পন্ন উচ্চশিক্ষার ভিত শক্ত হবে।
৪. বিভিন্নরকমের মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া
গোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালানো। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর জন্যও যতদিন
প্রয়োজন বিশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার অগ্রগতি সমর্থন করা।
৫. নির্ধারিত বিষয়ে সকল ধারায় অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূিচ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা।
কৌশল
শিক্ষার মাধ্যম
১. এই পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম হবে মূলত বাংলা তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য-অনুযায়ী নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি
ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষা দেওয়া যাবে। বিদেশীদের জন্য সহজ বাংলা শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক
২. মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে তিনটি ধারা থাকবে সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাধারা এবং প্রত্যেক ধারা
কয়েকটি শাখায় বিভক্ত থাকবে। সব ধারাতেই জন-সমতাভিত্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে
যথা- বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ স্টাডিজ, সাধারণ গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় অভিন্নœ শিক্ষাক্রম ও
পাঠ্যসূচি বাধ্যতামূলক থাকবে। প্রত্যেক ধারায় এসকল বিষয়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা
হবে। অবশ্য প্রত্যেক ধারায় সেই ধারা-সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিভিন্ন বিষয় থাকবে।
৩. ধারাসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ধারার শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের প্রয়োজন-ভিত্তিক বিন্যাস এবং
সেই অনুসারে স¦ স¦ শিক্ষাক্রম তৈরি করা হবে।
৪. শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হবে। উক্ত কমিটি সকল
ধারার জন্য শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূিচ প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবে।
৫. মাধ্যমিক স্তরে মাদরাসা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিশেষ বিষয়সমূহ ব্যতীত সকল ধারার জন্য অভিন্ন
শিক্ষাক্রম এবং সাধারণ ধারার বিশেষ বিষয়সমূহের প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দায়িত্ব পালন
করবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। মাদরাসা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিশেষ বিষয়সমূহের
পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবে যথাক্রমে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ।
অবকাঠামো এবং শিক্ষক ও স্টাফ
৬. বর্তমান উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী সংযোজন করা হবে এবং উচ্চ মাধ্যমিক
কলেজগুলোতে নবম ও দশম শ্রেণী খোলার ব্যবস্থা করা হবে। এই লক্ষ্যে বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণী
কক্ষ ও বিভিন্ন আসবাবপত্র ও শিক্ষা-সরঞ্জাম বৃদ্ধি করা হবে। উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে উচ্চতর
শ্রেণীসমূহে পাঠদানের জন্য ইংরেজিসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।
পদক্ষেপগুলির বাস্তবায়নে অর্থের জোগানের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
৭. সুষ্ঠু পাঠদানের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবকাঠামোর উন্নয়ন সাধন করা হবে এবং প্রয়োজনীয়
শিক্ষা-উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হবে। খেলাধুলার সরঞ্জাম ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা করা
হবে। গ্রন্থাগার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গ্রন্থাগারিক পদ সৃষ্টি করে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
৮. বিজ্ঞান-শিক্ষাদানকারী প্রত্যেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি-সংবলিত বিজ্ঞানাগার
থাকতে হবে এবং এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সুযোগবঞ্চিত শিক্ষার্থী ও অনগ্রসর অঞ্চল
৯. বিভিন্ন কারণে সংকুচিত সুযোগপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অগ্রসর শিক্ষার্থীদের অনুরূপ সম-সুযোগ সৃষ্টি
এবং বিভিন রকমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষার
ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত পদক্ষেপসমূহের অনুরূপ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও প্রযুক্তির উন্নয়ন
১০. অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে অধিক সম্পর্কিত সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায়-শিক্ষা
শাখার বিষয়সমূহ (যেমন অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবসায়-শিক্ষা), কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি
কম্পিউটার এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সরকারি
সহায়তা (যেমন শিক্ষকের বেতন-ভাতা, বিজ্ঞানশিক্ষার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ইত্যাদি) প্রদানের ব্যবস্থা
করা হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত
১১. শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালের মধ্যে ১ : ৩০-এ উন্নীত করা হবে।
শিক্ষক-নিয়োগ
১২. সরকারি কর্মকমিশনের অনুরূপ প্রস্তাবিত বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন প্রতি বছর যথাযথ লিখিত
ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন ধারার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নির্বাচন করবে

এবং তাঁদের মধ্য থেকে যথাযথ কতৃর্ পক্ষ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ করবে (বিস্তারিত অধ্যায়-
২৭)।
শিক্ষক-প্রশিক্ষণ
১৩. সকল বিষয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকগণকে অনতিবিলম্বে
প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য কাজে যোগদানের আগে মৌলিক
শিক্ষকতা-প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। শূন্যপদ পূরণের সময়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীদের
অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থী-মূল্যায়ন
১৪. দশম শ্রেণী শেষে জাতীয় ভিত্তিতে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই পরীক্ষার নাম হবে মাধ্যমিক
পরীক্ষা এবং এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বৃত্তি প্রদান করা হবে। দ্বাদশ শ্রেণীর
শেষে অরো একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, এর নাম হবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। উভয়
পরীক্ষা হবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে এবং পরীক্ষার মূল্যায়ন হবে গ্রেডিং পদ্ধতিতে। উচ্চ মাধ্যমিক
পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদান করা হবে। (বিস্তারিত অধ্যায় -২১)।
পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ
১৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রশাসনিকভাবে নিয়মিত ও কার্যকর পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
অন্যান্য
১৬. সকল ক্যাডেট কলেজ মৌলিক বিষয়সমূহে অভিন্ন শিক্ষাক্রম অনুসরণ এবং সাধারণ ধারায় পাবলিক
পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করবে।
১৭. ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন যেহেতু একটি বিদেশি
ধারায় হয় সেহেতু ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলকে বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হবে। সরকারি
অনুমোদনসাপেক্ষে এই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হবে। তবে উভয়ক্ষেত্রে সাধারণ ধারার সমপর্যায়ের
বাংলা এবং বাংলাদেশ স্টাডিজ পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ দু’টি বিষয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্তি
সাপেক্ষে ‘ও’লেভেল উত্তীর্ণকে এস.এস.সি এবং ‘এ’ লেভেল উত্তীর্ণকে এইচ.এস.সি-র সমমান
হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
১৮. সংস্কৃ ত ও পালি বিষয়ে প্রচলিত আদ্য, মধ্য ও উপাধি কোর্সটি প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ অব্যাহত
থাকবে। এক্ষেত্রে সব ধারার জন্য অভিন্ন বিষয় বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ স্টাডিজ, সাধারণ গণিত
ও তথ্যপ্রযুক্তির সাথে ধারা সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক বিষয় সংস্কৃ ত ও পালি শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি
আধুনিক শিক্ষা কোর্স প্রচলন করা হবে।
১৯. বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সুপারিশের আলোকে সনাতন পদ্ধতির সংস্কৃ ত ও পালি শিক্ষার
সার্টিফিকেট / উপাধির সমতাবিধান করা হবে।