বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা

140505031020_infra3
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
দক্ষ জনশক্তি জাতীয় উন্নয়নের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার ও
উদ্ভাবনের ফলে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নকৌশল ও পদ্ধতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো
আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও
যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অসম ও প্রতিকূল প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এ
অসম-প্রতিযোগিতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগসৃষ্টি ও শ্রমের মর্যাদাবৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের শিক্ষার্থীদের
বৃত্তিমূলক এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমে দ্রুত দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার ওপর
সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হবে। লক্ষণীয় যে, বর্তমানে গ্রামে কৃ ষি থেকে শুরু করে যান্ত্রিক নৌকা,
যন্ত্রচালিত আখ মাড়াইয়ের মেশিন, রাইস মিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন, পাওয়ার লুম, যন্ত্রচালিত তাঁত
ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে।এগুলোর উন্নতি ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি (ওঈঞ)-র
সংযোজন ঘটাতে হবে। দেশের প্রয়োজন ছাড়াও বিদেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই
চাহিদা আরো বাড়বে। কাজেই দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের আয় অনেক বৃদ্ধি
সম্ভব। অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
এই শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিম্নরূপ :-
১.দেশ ও বিদেশের চাহিদা বিবেচনায় রেখে সকল ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন স্তরের
মানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ।
২. অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগসৃষ্টি ও শ্রমের মর্যাদাবৃদ্ধির লক্ষ্যে এ শিক্ষার মাধ্যমে দ্রুত দক্ষ জনশক্তি
সৃষ্টি করা ।
৩. দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের আয় বৃদ্ধি
করা।
কৌশল
১. দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাথমিক স্তরের সকল ধারায় প্রাক-বৃত্তিমূলক ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাক্রম চালু
করা হবে। প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীকে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাক-বৃত্তিমূলক ও
তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাসহ আট বছর মেয়াদি শিক্ষা অবশ্যই সমাপ্ত করতে হবে।
২. অষ্টম শ্রেণী সমাপ্ত করার পর অর্থাৎ প্রাথমিক স্তর উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থী বৃত্তিমূলক/কারিগরি শিক্ষা
ধারায় ভর্তি হতে পারবে। এই ধারায় যারা যাবে তারা যেন ধাপে ধাপে তাদের নির্বাচিত কারিগরি
বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হবে ।
৩. অষ্টম শ্রেণী সমাপ্ত করার পর যারা কোনো মূল ধারায় পড়বে না তারা ছয়মাসের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ
গ্রহণ করে জাতীয় দক্ষতামান-১ জনশক্তি হিসেবে পরিচিত হবে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় নবম,
দশম ও দ্বাদশ শ্রেণী সমাপ্ত করে একজন যথাক্রমে জাতীয় দক্ষতামান ২, ৩ ও ৪ অর্জন করতে
পারবে।
৪. অষ্টম শ্রেণী সমাপ্ত করার পর শিল্প-কারখানা এবং উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে স্থাপিত সরকারি
টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট বা বেসরকারি বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন¦য়ে দেওয়া ১, ২ ও ৪ বছরের
বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়েও যথাক্রমে জাতীয় দক্ষতামান ২, ৩ ও ৪ অর্জন করতে পারবে।
৫. এস.এস.সি.পরীক্ষায় উত্তীর্ন শিক্ষার্থীরা এবং জাতীয় দক্ষতামান-৪ এর সনদধারীরা ক্রেডিট সমন্বয়ের
মাধ্যমে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য ডিপ্লোমা / বিজনেস ম্যানেজমেন্ট (একাদশ-দ্বাদশ) /
ডিপ্লোমা-ইন-কমার্স (একাদশ-দ্বাদশ) / সমমানের কোর্সে ভর্তি হতে পারবে। তবে বৃত্তিমূলক
শিক্ষাক্রম থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
৬. কারিগরি ডিপ্লোমা পর্যায়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে যোগ্যতা যাচাই করে ক্রেডিট সমন¦য়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট
স্নাতক পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা কোর্সে (ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল, কৃ ষি ইত্যাদি) ভর্তির সুযোগ দেওয়া
হবে।
৭. বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত হবে ১ : ১২।
৮. কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সকল শিক্ষাক্রমে যথাযথ দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব
প্রদান করা হবে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার সকল স্তÍরের শিক্ষাক্রমে ক¤িপউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি
শিক্ষাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
৯. ১৯৬২ সালের শিক্ষানবিশি আইনকে যুগোপযোগী করে দেশে ব্যাপক ভিত্তিতে শিক্ষানবিশ
(অ্যাপ্রেনটিসশিপ) কার্যক্রমের প্রবর্তন করা হবে।
১০. প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
১১. সর্বস্তরের সকল শিক্ষকের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে শিল্প কারখানায় বাস্তব প্রশিক্ষণ
বাধ্যতামূলক করা হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সকল বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য
ভিটিটিআই ও টিটিটিসি-র আসন এবং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র
সম্প্রসারিত করা হবে।
১২. বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার জন্য বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত মানসম্মত পুস্তক প্রণয়ন, অনুবাদ ও প্রকাশনার
ব্যবস্থা করা হবে।
১৩. বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
স্থাপন করা হবে। এছাড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, লেদার ইনস্টিটিউটসহ
এ ধরণের অন্যান্য ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
১৪. মাধ্যমিক স্কুল/বৃত্তিমূলক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদিতে কারিগরি শিল্প, কৃ ষি, ব্যবসা-বাণিজ্য
ইত্যাদি বিষয়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
১৫. কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সুসংহত করার জন্য দেশের সমস্ত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হবে। কারিগরি শিক্ষা
বোর্ডকে অধিকতর শক্তিশালী করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান ও জনবলের ব্যবস্থা করা হবে।
১৬. কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে।
১৭. কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ঘাটতি পূরণের জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
১৭ জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০
১৮. নতুন নতুন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্যায়ক্রমে
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে। তবে এগুলোতে অস্বচ্ছল পরিবারের
ছেলে-মেয়েদের স্বল্প ব্যয়ে পড়ার সুযোগ থাকবে।
১৯. প্রকৌশল ডিপ্লোমা ও অন্যান্য ডিপ্লোমা পর্যায়ের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের ভৌত সুবিধাদির
সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোর্সগুলো দুই শিফটে চালু করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে
নির্ধারিত পাঠদান সময় মানসম্মত পর্যায়ে বজায় রেখে এ ব্যবস্থা করা হবে।
২০. বৃত্তিমূলক ও ডিপ্লোমা পর্যায়ের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুবিধাদি ব্যবহার করে সান্ধ্যকালীন ও
খ-কালীন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে স্কুল পরিত্যাগকারী ও বয়স্কদের স্থানোপযোগী বিভিন্ন ধরণের
বৃত্তিমূলক শিক্ষাদান করে তাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করা হবে।
২১. যারা অষ্টম শ্রেণী বা মাধ্যমিক পর্যায়ের যে কোনো শ্রেণীর পরবর্তী পর্যায়ে যে কোনো (আর্থিক,
পারিপার্শ্বিক) কারণে পড়বে না তাদেরকে বৃত্তিমূলক কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা এবং তারা যাতে
তাদের নির্বাচিত কারিগরি শিক্ষা সমাপ্ত করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাস্বরূপ
উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। যুক্তিসঙ্গত স্বল্প সময়ের মধ্যে এরকম শিক্ষার্থীদের অধিকাংশকে
বৃত্তিমূলক শিক্ষাক্রমে নিয়ে আসা হবে।
২২. বেসরকারি খাতে মানস¤পন্ন বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে উৎসাহিত করা হবে এবং
এমপিওভুক্তিতে অগ্রাধিকার প্রদান এবং যন্ত্রপাতি, সাজ-সরঞ্জামসহ আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা
করা হবে।
২৩. যে সকল দেশে আমাদের দেশের মানুষ কাজ করতে যায় সে সকল দেশের শ্রম বাজার বিবেচনায়
নিয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়াদি কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত করা হবে এবং ঐ সকল দেশের
ভাষার নূন্যতম জ্ঞান লাভের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে ।
২৪. দেশ-বিদেশের কর্মবাজারের চাহিদার আলোকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পর্যায়ের সকল কারিকুলাম
নিয়মিতভাবে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হবে।
২৫. ভবিষ্যতে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে।