উচ্চশিক্ষা

uccho-shikkha
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞান সঞ্চারণ ও নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন এবং সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।
বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলোর জন্য স্বশাসন ব্যবস্থা অপরিহার্য। তবে তা যথানিয়মে নির্ধারিত
নীতিমালার আওতায় বাস্তবায়িত হবে এবং সরকার কতৃর্ ক প্রদত্ত অর্থ প্রস্তাবিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা
সে বিষয়ে সরকারি তদারকির ব্যবস্থা থাকবে। বর্তমানে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানসাধনায় নিযুক্ত বিশেষজ্ঞগণ আপন
বিষয়ে গভীরতা অর্জনের প্রয়োজনে তাঁদের সাধনার ক্ষেত্রকে ক্রমাগত সঙ্কুচিত করছেন, ফলে জ্ঞানের জগতে
বিভাজন ঘটছে। অন্যদিকে একটি বিপরীত প্রক্রিয়াও চলছে অর্থাৎ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পারস্পরিক
নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, অর্থনীতি ও অন্যান্য
বিষয় পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, বিশেষ করে
তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার ও বিশ্বজগত সম্পর্কে অভিনব উপলব্ধি। এই
পরিপ্রেক্ষিতেই জ্ঞানের জগতে সকল বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তি অতিক্রম করে একটি সমন্বয় সাধনের
প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানে প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন
দেশের প্রয়োজন সম্পূর্ণভাবে মেটাতে সমর্থ নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক ব্যবস্থায় পুনর্বিন্যাস
আবশ্যক। মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং ক্ষেত্রবিশেষে (যথা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসায়) বাস্তব প্রশিক্ষণ দিতে পারে
সেই আলোকে বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ নিয়মানুসারে চালিত হতে হবে।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিম্নরূপঃ
১.কার্যকরভাবে বিশ্বমানের শিক্ষাদান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা জাগানো এবং মানবিক গুণাবলী
অর্জনে সহায়তা দান।
২. অবাধ বুদ্ধিচর্চা, মননশীলতা ও চিন্তার স্বাধীনতা বিকাশে সহায়তাদান করা।
৩. পাঠদান পদ্ধতিতে সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে দেশের বাস্তবতাকে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, রাষ্ট্র ও
সমাজের সমস্যা সনাক্ত করা ও সমাধান বের করা।
৪. নিরলস জ্ঞানচর্চা ও নিত্যনতুন বহুমুখী মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার ভেতর দিয়ে জ্ঞানের দিগন্তের
ক্রমসম্প্রসারণ।
৫. আধুনিক ও দ্রুত অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে কার্যকর পরিচিতি ঘটানো।
৬. জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নেতৃ ত্বদানের উপযোগী বিজ্ঞানমনষ্ক, অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক,
মানবমুখী, প্রগতিশীল ও দূরদর্শী নাগরিক সৃষ্টি।
৭. জ্ঞান চর্চা, গবেষনা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী হতে জ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি।
৮. মেধার বিকাশ এবং সৃজনশীল নতুন নতুন পথ ও পদ্ধতির উদ্ধাবন।
৯. জ্ঞান সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ নাগরিক সৃষ্টি।
কৌশল
১. বিভিন্ন ধারার মাধ্যমিক শিক্ষা সফলভাবে সমাপ্ত করার পর মেধা, আগ্রহ ও প্রবণতার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করবে।
২. মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, বিভিন্ন কারণে অনগ্রসর এবং অন্যান্য
গোষ্ঠির সন্তানদেরকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আবাসিক সুবিধাসৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ ও বৃত্তি
প্রদানসহ বিশেষ সহায়তা দেওয়া হবে।
৩. শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে পারে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে (যেমন- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে)
উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হবে। কোটা পদ্ধতি বা অন্য কারণে ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হবে
না।
৪. উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বপ্রকার যতœœ নেওয়া প্রয়োজন। তারজন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৫. চার বছরের সম্মান স্নাতক ডিগ্রিকে সমাপনী ডিগ্রি হিসেবে এবং উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষকতা ব্যতীত অন্য
সকল কর্মক্ষেত্রে যোগদানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
৬. যে সকল কলেজে তিন বছর মেয়দি স্নাতক ডিগ্রি কোর্স চালু আছে পর্যায়ক্রমে সেখানে চার বছরের
স্নাতক সম্মান ডিগ্রি কোর্স চালু করা হবে।
৭. মাস্টার্স, এম.ফিল বা পি.এইচ.ডি-কে বিশেষায়িত শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং শুধুমাত্র
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকতা করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদেরকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে হবে।
গবেষণা নিশ্চিত করার জন্যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগে পর্যায়ক্রমে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম চালু
করে সেখানে নিয়মিতভাবে মাস্টার্স, এম.ফিল ও পি.এইচ.ডি ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
সাধারণত মা¯টার্স এক বছরের, এম.ফিল দু বছরের এবং পিএইচডি রেজিস্ট্রেশনের সময় হতে ছয়
বছরের মধ্যে শেষ করতে হবে।
৮. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন যে সকল কলেজে স্নাতকোত্তর শ্রেণী চালু আছে, সেসকল কলেজে এ
শ্রেণী অব্যাহত থাকবে। তবে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য তাদের গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার ও
অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে এবং শিক্ষকদের মান উন্নয়নে ব্যাপক শিক্ষক প্রশিক্ষণের
ব্যবস্থা করতে হবে। যে সকল কলেজে চার বছরের ডিগ্রি অনার্স কোর্স চালু করা হবে, প্রয়োজনে
সেগুলোতেও এই বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে।
৯. বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সকল ডিগ্রি কোর্স পর্যায়ে ১০০ নম্বরের/৩ ক্রেডিট ইংরেজি বিষয় সকল
শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক হবে।
১০. গবেষণার কাজে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে একযোগে অংশগ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে মৌলিক
গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের
গবেষণার উদ্দেশ্যে যথেষ্ট সংখ্যক আকর্ষণীয় মূল্যের গবেষণা অনুদান এবং সম্প্রতি প্রবর্তিত বঙ্গবন্ধু
ফেলোশিপ ছাড়াও আরো ফেলোশিপের ব্যবস্থা করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ডিগ্রি কলেজগুলোতে
গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১১. উচ্চশিক্ষার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি হবে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের। উচ্চশিক্ষায় বাংলায়
সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায় রচিত আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের
ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাংলা ভাষায় অনুদিত হওয়া প্রয়োজন। এই কাজকে জাতীয়ভাবে
গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উচ্চশিক্ষায় বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ব্যবহার অব্যাহত
থাকবে।
১২. উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, শান্তি ও সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃ তি
বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থাও থাকবে।
১৩. উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য শিক্ষাখাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা হবে। সরকারি
অনুদান ছাড়াও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যয়নির্বাহের জন্য শিক্ষার্থীর বেতন ব্যবহার করতে হবে
এবং ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহের চেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও
কলেজগুলোতে ভর্তি ফি ও বেতন খুবই সামান্য। অভিভাবকের আর্থিক সচ্ছলতার প্রত্যয়ন পত্রের
ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর বেতন নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে। এতে অসচ্ছল অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা উপকৃ ত
হবে। অসচ্ছলতা প্রমাণের মূল দায়িত্ব অভিভাবকের উপর ন্যস্ত থাকবে তবে তার জন্য যথাযথ
নিয়মনীতি প্রণয়ন করা হবে।
১৪. শিক্ষার্থীর মেধা ও অভিভাবকের আর্থিক সচ্ছলতার নিরিখে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃত্তি প্রদান
করা হবে। তাছাড়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে সহজ শর্তে যেন ব্যাংক ঋণ পেতে পারে সে
ব্যবস্থা করা হবে।
১৫. বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতিতে পাট, বস্ত্র ও চামড়া খাতের বিপুল গুরুত্ব ও সম্ভাবনার কথা
বিবেচনায় রেখে পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট, টেক্সটাইল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ অব
লেদার টেক্নোলজিকে অধিকতর শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
১৬. শিক্ষকদের সঞ্জীবনী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এলক্ষ্যে ছুটির সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের সমন্বয়ে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ-সেমিনারের ব্যবস্থা করা
হবে।
১৭. প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ নির্ধারিত অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার (ধপধফবসরপ পধষবহফধৎ) অনুসরণ
করবে। নতুন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রদান কোন তারিখে শুরু হবে, কোন পরীক্ষা কখন হবে সহ সারা
বছরের কর্মসূচি সংবলিত এই অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার শিক্ষা বছর শুরু হওয়ার আগে মুদ্রিত আকারে
প্রকাশ করা হবে।
১৮.  দেশের উচ্চশিক্ষার স¦ার্থে প্রস্তাবিত ও অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, শিক্ষাক্রম
ও পাঠ্যসূচি ও শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত উপযুক্ত
মানের হতে হবে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় জাতি, ধর্ম, বর্ণ, আর্থ-সামাজিক অবস্থান, শারীরিক
প্রতিবন্ধকতা নির্বিশেষে বৈষম্যহীন হতে হবে এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তা প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনা করা
যাবে না। এসব বিশ্ববিদ্যালয় স¦াধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি সংস্কৃ তির পরিপন্থি হতে পারবে
না এবং এরূপ কোন কার্যক্রম চালাতে পারবে না।
১৯. উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণায় উৎসাহিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের
গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কনসালটেন্সির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার পদক্ষেপ
নেওয়া হবে। যে সকল শিক্ষক এ ধরনের প্রকল্পে কাজ করবেন তাদের যথোপযুক্ত সম্মানী প্রদান করা
হবে। এরকম গবেষণা কার্যক্রম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু আছে। এই কার্যক্রম মূল্যায়ন করে
প্রয়োজনে পরিমার্জন করে একটি দিকনির্দেশনা-কাঠামো তৈরি করা হবে।
২০. উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য টেলিভিশনে সুবিধাজনক কোনো চ্যানেলে Ñযেমন বিটিভিতে দ্বিতীয়
চ্যানেলেÑঅধিকতর সময় বরাদ্দ, রেডিও ট্রান্সমিশন এবং মাল্টি ইনফরমেশন সিস্টেম চালু করার
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।