বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০১৬ : প্রত্যাশা ও প্রত্যয়

teacher

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ

লেখক : বিশ্ব শিক্ষক দিবস জাতীয় উদযাপন কমিটির সমন্বয়ক

আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর দেশে দেশে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষানুরাগী বিভিন্ন স্তরের মানুষ, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা নানা কর্মসূচিতে দিনটি উদযাপন করছেন। তবে কোন কোন দেশে অন্য দিনেও দিবসটি পালনের দৃষ্টান্ত আছে। ভারতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধা কৃষ্ণনের জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। থাইল্যান্ডে ১৬ জানুয়ারি। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৫ মে। দিনটিতে পুরো ক্লাস হয় না। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সুগন্ধি নানা রকম ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। সাবেক ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করেন। ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। শ্রীলঙ্কায় ৬ অক্টোবর শিক্ষক দিবস। দিনটিতে শুধু শিক্ষকদের নিজেদের ছাত্ররাই শ্রদ্ধা নিবেদন করে না, সর্বস্তরের মানুষ শিক্ষকদের অবদান, দুঃখকষ্টের কথা তুলে ধরেন। কৃতজ্ঞতা জানানোর স্মারক হিসেবে শুভেচ্ছা কার্ড পাঠায়। গণচীনে ১০ সেপ্টেম্বর ছাত্রছাত্রীরা ফুল ও শুভেচ্ছা কার্ড দিয়ে শিক্ষকদের শ্রদ্ধা জানায়। অস্ট্রেলিয়ায় দিবসটি পালিত হয় অক্টোবর মাসের শেষ শুক্রবার। রাশিয়া ও পাকিস্তানে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয় ৫ অক্টোবর। ২৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক দিবস পালিত হয় ওমান, সিরিয়া, মিসর, লিবিয়া, কাতার, বাহরাইন, আরব, আমিরাত, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া, জর্দান, সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও মরক্কোতে। তবে আগে পরে যেদিনেই পালিত হোক না কেন, পেশাগত মর্যাদা ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়, পেশায় সমস্যা ও সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের পন্থা নিরূপণ দিনের কর্মসূচির সিংহভাগ জুড়ে থাকে। থাকে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রত্যয়দীপ্ত উচ্চারণ।উল্লেখ্য, শিক্ষকদের অধিকার, করণীয় ও মর্যাদা সংক্রান্ত ইউনেস্কো আইএলও’র ১৯৬৬ সনের ১৪৫টি সুপারিশ আজকের দিনে গৃহীত হওয়ার ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯৪ সন থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিনটি উপলক্ষে ইউনেস্কো-আইএলও’র সঙ্গে, ইউএনডিপি, গ্লোবাল ক্যাম্পেইন ফর এডুকেশন, এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে থাকে এবং প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য নির্বাচিত হয়। এ বছরের নির্ধারিত বিষয় : ‘শিক্ষকের মূল্যায়ন, মর্যাদার উন্নয়ন’। বহু দেশে ৫ অক্টোবর দিবসটি পালিত হলেও অন্যদিনে দিনটি উদযাপনের দৃষ্টান্তও রয়েছে। ২০১১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পৃষ্ঠপোষক করে শিক্ষক সংগঠনগুলো ও এনজিওদের নিয়ে গঠিত বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটির ব্যানারে দিবসটি পালিত হচ্ছে। আগের বছরগুলোর মতো এবারও কেন্দ্রীয় প্রধান কর্মসূচি থাকছে শহীদ মিনারে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাকর্মী ও অভিভাবকদের র‌্যালি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তনে দিবসটির উপর আলোচনা, গুণী শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান, ইউনেস্কো, আইএলও, ইউএনডিপি. ইউনিসেফ, গ্লোবাল ক্যাম্পেইন ফর এডুকেশন, এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের, বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে প্রদত্ত যৌথ ঘোষণা পাঠ, শিক্ষকদের পক্ষ থেকে প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ যার মধ্যে থাকবে শিক্ষার্থীদের উন্নত পাঠদান, শারীরিক শাস্তি ও মানসিক শাস্তি দান থেকে নিবৃত্ত থাকা, মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের আরও বেশি ভূমিকা পালন, মেয়েদের বাল্যবিবাহ রোধ ও নিরুৎসাহিত করণসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনায় বিশেষভাবে থাকবে, শিক্ষকদের মর্যাদা, পাঠদানের মান, পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল করেও উচ্চতর স্তরে ভর্তি পরীক্ষায় চোখে-পড়া অকৃতকার্যতা, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নবিদ্ধ কার্যকারিতা, শিক্ষা আইন এখনও সংসদে পাস না হওয়া, দেড় লাখের তো স্কুল কলেজ শিক্ষকের বিনা বেতনে (এমপিও না পেয়ে) কাজ করে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন, শিক্ষক নিয়োগ ও স্থায়ী শিক্ষা কমিশন চালু না হওয়ার মতো বিষয়গুলো। সে সঙ্গে নারী শিক্ষকদের প্রতি সম্প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, শিক্ষকদের হাতে শিক্ষার্থীদের অব্যাহত শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন এবং শিক্ষকদের একটি অংশের চরম নৈতিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গ ইভটিজিংয়ের নামে মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপর যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের মতো বিষয়। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, ইউনেস্কো, আইএলও, ইউনিসেফ, দেশি বিদেশি শিক্ষা এনজিও সমন্বয়ে গঠিত বিশ্ব শিক্ষক দিবস জাতীয় উদযাপন কমিটির দিনের কর্মসূচিতে বিভিন্ন দেশের মতো শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, শিক্ষার উন্নয়নে তাদের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতির বিষয়টি থাকবে।বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ইতিহাসশিক্ষকদের অধিকার ও করণীয় প্রসঙ্গে বেশ কয়েক বছর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈঠক ও মতবিনিময়ের পর জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টেবর প্যারিসে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারসমূহের সম্মেলনে ১৪৫টি সুপারিশসহ ‘শিক্ষকদের মর্যাদা সনদ’ গৃহীত হয়। পরে জাতিসংঘের আরেক সংগঠন আইএলও তা অনুমোদন করে। এ ধারাবাহিকতায় ২৮ বছর ধরে আলোচনা পর্যালোচনান্তে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনে তৎকালীন মহাপরিচালক ফেডেরিকো মেয়রের প্রস্তাবক্রমে ৫ অক্টোবরের সুপারিশগুলো স্মরণীয় করে রাখতে ওই দিনে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে ১৯৬৬ সালের সুপারিশমালা ছিল মূলত নার্সারি, কিন্ডার গার্টেন, প্রাথমিক, কারিগরি, বৃত্তিমূলক, চারুকলাসহ স্কুলে পাঠদানকারী শিক্ষকদের জন্য। মাধ্যমিক (উচ্চ) পরবর্তী স্তরসমূহের সুস্পষ্ট উল্লেখ সেখানে ছিল না। এ প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ১৫ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর এক বিশেষ অধিবেশনে উচ্চতর স্তরে শিক্ষা দানকারী শিক্ষকদের মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণীত হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে, ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের উভয় সুপারিশমালা যুগ্মভাবে ‘শিক্ষকদের মর্যাদা সনদ’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বিশ্বব্যাপী সর্বস্তরের শিক্ষক ওই সনদের স্মারক দিবস হিসেবে ৫ অক্টোবর প্রতি বছর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালন করবেন।১৯৬৬ সনদের ৪ বৈশিষ্ট্য: ০১ ‘সামগ্রিক জনস্বার্থে যেহেতু শিক্ষা এক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেহেতু শিক্ষাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করতে হবে।’ (ধারা-১০ গ) যেহেতু শিক্ষা অর্থনৈতিক উন্নতির অপরিহার্য উপাদান, সেহেতু শিক্ষা পরিকল্পনা সমগ্র অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’ (ঐ-ঘ) ০২. ‘শিক্ষক সংগঠনগুলোকে শিক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক অবদানকারী শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শিক্ষা সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে সম্পৃক্ত করতে হবে।’ (ধারা-৯)। ০৩. ‘শিক্ষকদের বেতন এবং কর্ম পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়াদি শিক্ষক সংগঠন এবং নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে’। (ধারা-৮২) ‘শিক্ষকদের বেতন এমন হতে হবে যাতে সমাজে কোন ব্যক্তির যোগদান, তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিফলিত হয়।’ (ধারা-১১৫) ‘বেতন কাঠামো এমনভাবে নির্ধারিত হবে যাতে শিক্ষকদের মধ্যে বেতন সংক্রান্ত কোন বৈষম্য বা সংঘাতের সৃষ্টি হতে না পারে। তা সমতাভিত্তিক হবে এবং শিক্ষকদের কোন শ্রেণী বা গ্রুপের মধ্যে কোন অবিচার/অসমতার সুযোগ সৃষ্টির অবকাশ থাকবেন। (ধারা-৭৯)১৯৯৭ সনদের ৪ বৈশিষ্ট্য: ০১. উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষকতা জনসেবা দানকারী একটি পেশা যা উচ্চ শিক্ষিত, বিশেষঞ্জ ও বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালিত হবে সেজন্য প্রয়োজন আজীবন পাঠ গ্রহণ, গবেষণায় আত্মনিয়োগ। (ধারা-৬) ০২ উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষক/শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পাঠদান ও গবেষণার অনুকূলে থাকতে হবে। (ধারা-৭) ০৩. উচ্চশিক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনসমূহকে শিক্ষার উন্নয়নে নৈতিক শক্তি হিসাবে গণ্য করে অপরাপর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে শিক্ষা সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। (ধারা-৮) ০৪. উচ্চশিক্ষা, নিবেদিত হবে মানব উন্নয়ন ও সমাজের অগ্রগতিতে। (ধারা-১০ এর-ক)বিশ্ব শিক্ষক দিবসে নতুন মাত্রাতিনটি কারণে এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস নতুন মাত্রা পাচ্ছে। প্রায় দুই শত দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করে ইউনেস্কোর শিক্ষা বিশেষজ্ঞ টিম মতো প্রকাশ করেছে যে, শুধু ভালো শিক্ষানীতি হলেই চলবে না। বিভিন্ন দেশের শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি আগের যে কোন সময়য়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। সেজন্য বিভিন্ন দেশের শিক্ষানীতিতে শিক্ষক সংক্রান্ত প্রস্তাব ও সুপারিশ বাস্তবায়নের ধারা পর্যালোচনা করে ইউনেস্কো এ বছর শিক্ষকনীতির প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এর জন্য শিক্ষকনীতি তৈরির গাইড বা রূপরেখাও ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে ইনিসিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (আইএইচডি) এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কোর প্রস্তাবিত শিক্ষকনীতি নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সেখানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, ও উচ্চ শিক্ষা স্তরের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, দেশি বিদেশি শিক্ষা এনজিও প্রতিনিধি ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অংশ নেন। ইউনেস্কোর শিক্ষকনীতির প্রস্তাবকে জোরালো সমর্থন দিয়ে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, শিক্ষকনীতিতে শিক্ষকদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন, পদোন্নতি থেকে শুরু করে ক্যারিয়ার পাথ অথবা উন্নয়নের কাম্য ধাপ বা পর্যায়গুলোর সুবিন্যস্ত উল্লেখ থাকতে হবে। বাংলাদেশে শিক্ষকনীতি নিয়ে এটাই প্রথম সভা।অন্য যে দুটি বিষয় এবছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পটভূমি তৈরি করেছে তার মধ্যে আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় শিক্ষকের অধিনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা ও পাবলিক এডুকেশনে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রসঙ্গ। উন্নত, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করে ইউনেস্কো প্রস্তাব করেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় শিক্ষক নেতৃত্ব জরুরি। এ প্রস্তাবে সুনির্দিষ্টভাবে প্রধান শিক্ষকের কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান বলতে স্কুলে প্রধান শিক্ষক ও কলেজে অধ্যক্ষকে মনে করা হয়। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে কার্যত তারা আর প্রতিষ্ঠান প্রধান নেই। তাদের ভূমিকা গৌণ বললেও কম বলা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ভূমিকাই নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় এখন মুখ্য ভূমিকায় জনপ্রতিনিধি পরিচয়ে দলীয় রাজনীতিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তা। কোন কোন সময় তাকে কমিটির সভায় বসতেও দেয়া হয় না। বাইরে বসিয়ে রাখা হয়। ‘স্কুল লিডারশিপ’ শিরোনামে ইউনেস্কোর প্রস্তাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বের কথা বলা হয়েছে। যিনি তার সহকর্মী শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়ে কাজ করবেন। আমাদের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান বলতে আমরা এখনও প্রধান শিক্ষক অথবা অধ্যক্ষকে বুঝি ঠিকই। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় তার ভূমিকা নগণ্য। অথবা ভূমিকাই নেই। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়টি হলো মূলত শিক্ষার্থীকে ঘিরে। অভিভাবকের সন্তান বা পোষ্যকে গড়ে-পিটে মানুষ করেন শিক্ষক। তার পাঠদান ও জীবনে ক্রমোন্নয়নে, দেশাত্মবোধ, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে শিক্ষক ও পিতামাতার ভূমিকা, দায়দায়িত্বই প্রধান। কিন্তু এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা পালনের সুযোগ নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্কুলে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ইউনেস্কো অবতারণা করেছে। সে অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান বলতে বাস্তবেই প্রধান শিক্ষক অথবা অধ্যক্ষকেই হতে হবে। তবে তিনি যাতে একদেশদর্শী না হয়ে যান, সহকর্মী শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিশিষ্টজনদের বিশেষ করে এলাকার প্রকৃত শিক্ষানুরাগীদের যথাযোগ্য ভূমিকা পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সেজন্য ব্যবস্থাপনা কমিটি ছাড়াও বিভিন্ন পরামর্শক কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। যেমন, প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন কমিটি, অর্থ কমিটি, সংস্কৃতি চর্চা কমিটি, শিক্ষক অভিভাবক শিক্ষার্থী মিলে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তি প্রতিরোধ কমিটি। বর্তমানে শিক্ষা তথা মানব সম্পদ উন্নয়নে জাতিসংঘের উদ্যোগ ও ভূমিকা এখন আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সকলের জন্য শিক্ষা, এমডিজি বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করে নানা অর্জন ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়নের ১৫ বছর পর গত বছর টেকসই উন্নয়নের যে ১৭ লক্ষ্য জাতিসংঘের প্লাটফরম থেকে ঘোষিত হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষা সম্পর্কিত। ৪নং লক্ষ্য পুরোপুরি শিক্ষা সংক্রান্ত। এতে মানসম্পন্ন শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকারের কথা আছে। উল্লেখ আছে কন্যাশিশু ও নারী উন্নয়ন, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী/ অটিস্টিকদের উন্নয়নের প্রসঙ্গ। সর্বশেষ জাতিসংঘ পাবলিক শিক্ষা অথবা সরকারি উদ্যোগ, আনুকূল্য ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে বেশিরভাগ মানুষের সন্তানেরা লেখাপড়া করে যেমন সরকারি প্রাইমারি স্কুল ও পরবর্তী স্তরের প্রতিষ্ঠান, সেখানে সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। সে সঙ্গে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধের কথা বলেছে। জাতিসংঘ ও ইউনেস্কোর এসব প্রস্তাব ও সুপারিশের পটভূমিতেই বাংলাদেশসহ বিশ্বে বিভিন্ন দেশে এবারের বিশ্ব শিক্ষক পালিত হচ্ছে।শিক্ষায় বরাদ্দ ও প্রসঙ্গ কথাশিক্ষায় বিনিয়োগ শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হলেও বাংলাদেশের বাজেটে শিক্ষা বরাদ্দ কমে যাচ্ছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে আগের চেয়ে খানিকটা বেশি হলেও আশানুরূপ নয়। এর ফলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নীতি বা পরিকল্পনা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হওয়ার কারণে দেশ সামনে যাওয়ার বদলে উন্নয়নের মাপকাঠিতে পিছিয়ে যাওয়ায় পথে হাঁটছে। ‘সকলের শিক্ষা অধিকার সুরক্ষা, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরের শিক্ষকদের জন্য প্রচলিত বেতন কাঠামোর চেয়ে বেশি ও আকর্ষণীয় স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালু, স্থায়ী বিধিবদ্ধ শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষক নিয়োগ কমিশনের বিধান, শিক্ষা অধিকার আইন পাস ও ন্যায্য কর ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সে জন্য সময়ের দাবি। ইউনেস্কো প্রকাশিত একাধিক গ্লোবাল মনিটিরিং রিপোর্টে শিক্ষা ও শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য পরিসংখ্যান ও অকাট্য যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। এদিকে আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিভিন্ন ইতিবাচক লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রসঙ্গে। কিন্তু বাংলাদেশে সাধারণ ভাবে এ আশঙ্কা ব্যক্ত হয় যে, পরিকল্পনার ‘পরী’ উড়ে যায়, পড়ে থাকে ‘কল্পনা’। তার পরও আশা করতে হয়।আশাবাদের কথাকারণ শিক্ষা নিয়ে দলীয় রাজনীতি যেমন আছে, শিক্ষায় অর্জনের ধারাবাহিকতাও আছে। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সরকার, সর্বোপরি শিক্ষার্থীর চাহিদা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় শিক্ষায় উন্নয়ন ও শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি হয়েছে আগের যেকোন সময়কে অতিক্রম করে। তার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান হয়নি। নারী পুরুষ, গ্রাম শহর, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য কমেনি। তা এখনো পাহাড় সমান। সরকারি শিক্ষকদের পদোন্নতি প্রায় নিয়মিত বিষয় হলেও বেসরকারিদের বেলায় তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার এমপিও পাবার যোগ্য বলে নির্বাচিতরা, সংখ্যায় লক্ষাধিক, দুই দশক ধরে বেতন-ভাতার সরকারি অংশ বা এমপিও থেকে বঞ্চিত। শিক্ষামন্ত্রী হ্যাঁ বললেও সরকার হ্যাঁ বা না কোনটাই বলে না। বছর তিনেক আগে এমপিও’র নীতিমালা তৈরি হচ্ছে বলা হলেও তার বাস্তবে কোন অগ্রগতি নেই। ফলে বঞ্চিতদের বঞ্চনা চলছেই। অন্যদিকে শিক্ষার মান বৃদ্ধি, গুণগত শিক্ষা, বিশ্বমানের শিক্ষা নিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি শুনতে আমরা যতটা অভ্যস্ত, শ্রেণী কক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত হ্রাস, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তার পরবর্তী স্তরে শিক্ষক স্বল্পতা তথা শিক্ষক সংকট নিরসনে যথাযথ উদ্যোগ ততটা চোখে পড়ে না। অভিভাবকদের মত, শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে। তবে যে ক্ষেত্রে হয়েছে তার প্রচার না হয়ে যেখানে হয়নি তার প্রচার বেশি হচ্ছে। অবৈতনিক শিক্ষার কথা বলা হলেও সন্তানদের শিক্ষার জন্য তাদের ব্যয়ভার না কমে বেড়েই চলেছে। আমার কাছে মনে হয়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো শিক্ষার্থীর শিক্ষা অধিকার ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দান। অহেতুক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিলম্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ পরিহার করা। শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও তার মূল্যায়নকে অগ্রাধিকার ভিত্তিক বিবেচনায় নেয়া। উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া ক্ষমতাবানদের পরিবর্তে ইউনেস্কোর সুপারিশের আলোকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও অভিভাবকের কার্যকর অবস্থানকে যথোচিত স্বীকৃতি দান এবং জাতিসংঘে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ। বিশ্ব শিক্ষক দিবস অমর হোক।